হাঁসের পালকের চেয়েও হাল্কা একটি মৃত্যুর গল্প

শহীদুল জহির ব্যক্তি জীবনে অত্যন্ত নিরব একজন মানুষ ছিলেন। এমনকি বলতে হয়, মৃত্যুর আগে অনেকেই জানতেন না বাংলাদেশের মাটিতে তার মতো ভিন্ন ধারার একজন লেখক ছিলেন। তার অসাধারণ সব গল্প বিভিন্ন সময় প্রকাশ পেলেও, লেখক শহীদুল জহির লোক-চক্ষুর আড়ালেই জীবন কাটিয়েছেন। তার গল্প লেখার ভিন্নতা পাঠককে নেশাগ্রস্থ করে তোলে।

তার এমনই এক অসাধারণ উপন্যাস “আবু ইব্রাহিমের মৃত্যু”। প্রথমআলোর বর্ষসেরা বইয়ের খেতাবটি পেলেও শহীদুল জহিরের তা দেখে যাওয়ার সৌভাগ্য হয়নি।

Abu Ibrahimer Mrittuউপন্যাসটির মূল চরিত্র আবু ইব্রাহিম একজন নির্জন সাধারণ মানুষ। ব্যক্তি জীবনে স্ত্রী-কন্যা-পূত্র নিয়ে তার মধ্যবিত্ত সংসার। এ মধ্যবিত্ত্ব অবস্থার মাঝেও তার ভেতর কাজ করে এক ধরনের শূন্যতা। যে শূন্যতা খোদ্ শহীদুল জহিরও বু্ঝে উঠতে পারেনি বলেই আমার মনে হয়। হয়ত, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের ব্যর্থ প্রণয়ের বিষন্নতা কিংবা ছাত্র জীবনের রাজনৈতিক আদর্শ থেকে নিজের বিচ্যূতি। এসবই হয়তো আবু ইব্রাহিমের শূন্যতার কারণ হয়ে উঠতে পারে। আবার হয়ত- স্ত্রী মমতার প্রতি তার অব্যক্ত ভালোবাসা যা হয়ত সে নিজেও বুঝে উঠতে পারে না। কিংবা মমতাকে বোঝাতে পারে না। কিংবা ব্যর্থ প্রেমের কাঙালপনা সত্ত্বেও আবু ইব্রাহিম এক সময় অনুভব করে, হেলেনকে ছাড়া তো সে এতদিন খারাপ থাকেনি। এ সবই যেন পাঠককে বিভ্রান্তির দিকে নিয়ে যায়। হয়ত- লেখক নিজের ইচ্ছাতেই পাঠককে বিভ্রান্ত করতে চায়; হয়ত আবু ইব্রাহিমই বিভ্রান্তময় একটি চরিত্র হয়ে উঠে। Continue reading

হিমালয়ের ‌‘বীক্ষণ প্রান্ত’

1236760_10201773344033524_17317727_n

গণিতের ইতিহাস জুড়ে দেখা যায় ‘পাই’-এর মান নির্ভুলভাবে নির্ণয়ের ব্যাপক চেষ্টা করা হয়েছে। এমনকি, এই ধরণের প্রচেষ্টা কখনও কখনও সংস্কৃতির অংশও হয়েছে। এই অমূলদ পাইকে ব্যাখ্যা করা সহজ। আবার অন্যদিকে কঠিনও। সংখ্যাতত্ত্ব দিয়েই লেখাটি শুরু করলাম।

কারণ আছে। ব্যক্তির নাম ‘হিমালয় পাই’। ব্লগের জগতে এ নামেই পরিচিত। গল্পের তুমুল সমালোচক হিমালয় পাই। আমিও নিজে মাঝে মাঝে ভাবতাম এ মানুষটিকে ব্যাখ্যার মধ্যে আনা সম্ভব না। অবশ্য পৃথিবীর সব মানুষের চরিত্রই অনেকটা পাইয়ের মতো।

যাইহোক, রহস্যমাখা চরিত্র। চুপচাপ, পাগল-টাগল টাইপ মানুষ হিমালয় পাই (ব্যক্তিগত মতামত)।

যা ভাবে তা নিয়েই এগিয়ে যাওয়ার সাহস বুকে রাখে। হিমালয় পাই নামটা সামনে এলে এ চরিত্রই মাথায় ঘুরপাক খায়। তবে ব্যক্তিগতভাবে আমি ওনাকে তেমন চিনি না। অনলাইন বা ভার্চুয়াল চেনাজানা। এর বেশি কিছু না! Continue reading

তালেয়া রেহমানের লেখালেখি

কেউ একজন এসে প্রশ্ন করলো, আপনি কেনো লিখেন? তখন উত্তরটা কিভাবে দেবেন? অথবা এই ধরনের প্রশ্নের উত্তরে আপনি কি বলেন?

একবার এক নোবেল জয়ী লেখককে একজন প্রশ্ন করেছিলেন, আপনি কেনো লিখেন?

উত্তরে তিনি বলেছিলেন, সমাজের বিভিন্ন বাস্তবতায় আমি সন্ধিহান হয়ে পড়ি । বিভিন্ন ধরনের জটিলতায় পড়ে আমি আর্তনাদ করতে থাকি। তখন তা প্রকাশের কোনো জায়গা আমি পাই না। তাই মাধ্যম হিসেবে বেছে নিই লেখা।

এই দার্শনিক টাইপ উত্তর আপনিও দিতে পারেন। তবে এমন কেউ যদি হঠাৎ প্রশ্ন করে বসে, আপনি কিভাবে লিখেন? Continue reading

লেখক হুমায়ূনের উপন্যাসে সম্রাট হুমায়ূন

হুমায়ূন আহমেদ কোনো ইতিহাসবিদ নন। তিনি ইতিহাস লেখেন না। তবে ইতিহাস নিয়ে ভাবেন, পড়েন।  ২০১১-এর একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছিল তার বই ‘বাদশাহ নামদার’। বইটি লিখিত হয়েছে মোগল সম্রাট হুমায়ূনকে নিয়ে।

প্রশ্ন তৈরি হতেই পারে, হুমায়ূন কী ইতিহাসবিদ? তিনি কেন লিখতে গেলেন মোগল সম্রাট হুমায়ূনকে নিয়ে? লেখক হুমায়ূনই বা কিভাবে তাকে উপন্যাসে উপস্থাপন করেছেন?  আসলে এ উপন্যাসেই প্রমাণ হয়ে গেলো, জনপ্রিয় ধারার লেখক হলেও হুমায়ূন আহমেদ যে ইতিহাসের মধ্যে প্রবেশ করেও তার চিরচেনা রসবোধ দিয়ে তৈরি করে ফেলতে পারেন এক অন্যরকম উপন্যাসের জগত।

লেখক হুমায়ূনের উপন্যাসে সম্রাট হুমায়ূন উপন্যাসের শুরুতে লেখক ভূমিকায় এ ধরনের ইতিহাস নির্ভর উপন্যাস লেখার কারণ হিসেবে বলেন, ‘শৈশবে আমাদের পাঠ্যতালিকায় চিতোর রানীর দিল্লির সম্রাট হুমায়ূনকে রাখি পাঠানো- বিষয়ক একটা কবিতা ছিল। একটা লাইন এরকম: “বাহাদুর শাহ্ আসছে ধেয়ে করতে চিতোর জয়।” এই কবিতা শিশুমনে প্রবল ছাপ ফেলেছিল বলেই শেষ বয়সে সম্রাট হুমায়ূনকে নিয়ে উপন্যাস লিখতে বসব এরকম মনে করার কোনো কারণ নেই।

সব ঔপন্যাসিকই বিচিত্র চরিত্র নিয়ে কাজ করতে ভালোবাসেন। এই অর্থে হুমায়ূন অতি বিচিত্র এক চরিত্র। যেখানে তিনি সাঁতার জানেন না সেখানে সারা জীবন তাঁকে সাঁতরাতে হয়েছে স্রোতের বিপরীতে। তাঁর সময়টাও ছিল অদ্ভুত। বিচিত্র চরিত্র এবং বিচিত্র সময় ধরার লোভ থেকে ‘বাদশাহ নামদার’ লেখা হতে পারে।’ Continue reading

পাহাড় আর নদীর বাঁকে তানবীরা তালুকদার

রেহানা সুলতানার ব্যস্ততা দিয়েই নারী দিবসের গল্পের শুরু। ‘নারীকেন্দ্র’ নামে একটি সংগঠনের দায়িত্বে আছেন তিনি। ৮ মার্চ বিশ্বের সব নারীবাদি সংগঠনের মত তারাও আলোচনা সভার আয়োজন করেছেন। যেখানে রেহানা সুলতানা মূল বক্তা।

এরপর রেহানা সুলতানার নানান ব্যস্ততার কথা উঠে আসবে গল্পে। এক পর্যায়ে তার ঘরের ভেতরও আমরা ঢুকে যাবো। যেখানে দেখবো তিনি শাশুড়ির সঙ্গে কেমন আচরণ করেন। এছাড়াও নিজের মেয়ের সঙ্গে অদৃশ্য দেয়ালের কথাও জানা যাবে।

একজন নারীর অন্য নারীর প্রতি নানান মনোভাবের প্রকাশও ঘটবে গল্পে। তবে গল্পের শেষে অন্য কিছু অপেক্ষা করছে। গল্পের শেষে তার ব্যক্তিগত ড্রাইভার জলিল তার মেয়ের আত্মহত্যার খবর নিয়ে হাজির হবে রেহানা কিংবা পাঠকের কাছে। আকুতি নিয়ে তার সমস্যার কথা বলবে। তার জন্য মায়া দেখাবে রেহানার মেয়ে টিয়ানা। এছাড়া আমরা কেউই জলিলের মেয়ের জন্য কাঁদবো না। জলিলের মেয়ে রফেজার মতো দিনে কত মেয়ে এ দেশে মরে ভুত হয়। কতো মেয়ে দিনে আত্মহত্যা করে। এতো মেয়ের জন্য মায়ায় জড়ানোর সময় কার আছে? আমাদের যেমন নেই তেমনি নেত্রী রেহানা সুলতানারও নেই। রেহানা যেমন টিয়ানাকে ধমক দিয়ে নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। সঙ্গে আমরাও মরে যাওয়ার গল্প একটি গল্প মনে করেই পরের গল্পে চলে যাই।

এ গল্পটির নাম ‘নারী দিবসের ব্যস্ততা’। এবছর একুশে বই মেলায় তানবীরা তালুকদারের প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘পাহাড় আর নদীর গল্প’ প্রকাশিত হয়েছে জাগৃতি প্রকাশনী থেকে। প্রতিটি গল্পের প্রধান চরিত্র নারী। নারীদের ঘিরেই তানবীরার জগৎ। তিনি গল্পের ভেতর দিয়ে নারীদের মনে ঘোরাফেরা করেন। বোঝার চেষ্টা করেন নারীর মন। হয়ত তানবীরা নিজেকেই সেখানে আবিষ্কার করার চেষ্টা করেন।

ছোট ছোট গল্পের ভেতর এগিয়ে তিনি কখনও পৌছে যান নারীর শৈশবে, কখনও কৈশোরে, কখনও বা পরিণত বয়সে। প্রতিটি বয়সে নারীর মন বদলায়, বদলায় তার শরীরও। এ বদলের মাঝে নারীর ভাবনার জগতে ঘটে রঙের খেলা। যে খেলায় তানবীরাও অংশ নেয়।

একুশটি গল্প গ্রন্থিত হয়েছে ‘পাহাড় আর নদীর গল্প’ গ্রন্থে। প্রথম গল্প ‘না বলা গল্প’। মেয়েরা নাকি পুরুষের চোখের ভাষা বোঝে। তবে পুরুষের কখনও মেয়েদের চোখের ভাষা বোঝার ক্ষমতা হয় না। এ বক্তব্য অবশ্য আমার না। শোনা কথা। তবে এ কথা আমি বিশ্বাস করি বটে। Continue reading

‘তাজতন্দুরি’ : অভিবাসী জীবনের ডকুফিকশন

উপন্যাসের শুরুই হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একটি ঘটনা দিয়ে। গোলার আঘাতে পা উড়ে গেছে। যুদ্ধের ভয়াবহতা কতটা নির্মম হতে পারে শুরুতেই লেখকের বর্ণনায় সেগুলো উঠে এসেছে। উত্তম পুরুষে লেখা প্লটে বলা হয়েছে এভাবে :

… ডিউটিতে ছিল তখন থার্ড ইঞ্জিনিয়ার,  জীবনে আর দেখা হয়নি ওর চাঁদমুখ, পরে জেনেছি, সে ছিল জাহাজ থেকে পানিতে লাফিয়ে পড়া শেষ নাবিক, জাহাজে অবশ্য এমনই নিয়ম, আমাকে ওভাবে ঝুলে থাকতে দেখে দৌড়ে আসে ক্যাপ্টেন, টেনে উঠাতে যেয়ে দেখে পায়ের একটা পেশি আমাকে আটকে রেখেছে সিঁড়ির সঙ্গে, এক মুহূর্ত ভাবে, তারপর দৌড়ে রান্নাঘরে যায়, মাংস কাটার ছুরি দিয়ে এক কোপে পেশিটা কেটে ফেলে, ঝুপ শব্দ শোনার জন্য চেতনা অবশিষ্ট ছিল তখনও, সিঁড়ির সঙ্গে ডেকের আংটায় ঝুলে মৃত্যুকে দেখি অনেক কাছ থেকে …

তাজতন্দুরি
কামাল রাহমানের ‘তাজতন্দুরি’ উপন্যাসে শুরুর পর্ব পড়েই পাঠকের মন আটকে যাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়বহতার সঙ্গে। অনেকে ভাবতে পারেন হয়তো সে সময়েরই কোনো এক গল্প বলবেন লেখক। তবে গল্পের বাঁক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে স্পষ্ট হবে যুদ্ধের দাবানল ছাপিয়ে তা পৌঁছে গেছে জীবনের যুদ্ধে। প্রবাসে অনভিজ্ঞ বাঙালিদের জীবন সংগ্রামের পর অভিজ্ঞ হয়ে ওঠা। নিরন্তর নিজেকে অপরিচিত জায়গায় খাপ খাইয়ে নেওয়ার প্রসঙ্গটিই খুব উজ্জ¦লভাবে উপন্যাসে দেখা দেয়।

উপন্যাসে লেখক দুটি চরিত্র নিয়ে খেলা করেছেন। রাফি ও সারোয়ার।  তেরো পর্বে বিস্তৃত উপন্যাসে বেজোড় পর্বে উত্তম পুরুষে রাফি বর্ণনা করেছেন যুদ্ধের পর ব্রিটেনে বাঙালির অভিবাসনের সম্পূর্ণ ইতিহাস। আবার জোড় পর্বে এসেছে সারোয়ারের গল্প। যেখানে বর্ণনা করা হয়েছে ব্রিটেনে প্রেম ও ভালোবাসার রঙিন স্বপ্নগুলো। Continue reading

স্মৃতিকাতর চরিত্রগুলো নিয়ে আহমাদ মোস্তফা কামাল

জীবনের সংজ্ঞা বোধ করি আজ অবধি কেউ বের করতে পারেনি। যদি কেউ করেও থাকে তবে সে সংজ্ঞার সঙ্গে একমত হওয়ার মতো মানুষ খুব কমই পাওয়া যাবে। মানুষের জীবন আসলে কতদূর যেতে পারে? এক জীবনে মানুষ কত কাজই করতে পারে? জীবনের কাছে সব ঘটনা কিংবা কাজের মূল্যই বা কতটুকু? এক জীবনে কত প্রশ্নের উত্তর মেলে? সম্ভব না। কখনও জীবনের কোনো প্রশ্নের উত্তর পাওয়া সম্ভব না।

জীবন অসংজ্ঞায়িত। এর কোনো সংজ্ঞা নেই। জীবনের শেষ আছে। অনেকে আবার বলবেন, জীবন শেষ পর্যন্ত অসমাপ্ত অধ্যায়। একবার ক্যাথরিন মাসুদকে প্রশ্ন করেছিলাম তারেক মাসুদের অসমাপ্ত কাজ নিয়ে। উত্তরে তিনি বলেছিলেন, মানুষের জীবনের সব কাজ অসমাপ্তই থেকে যায়।

কখনও কোনো কাজের সমাপ্তি নেই। তাহলে মানুষ আসলে বেঁচে থাকে কি করে? কিংবা কি নিয়ে? এখানেও নানান মত পাওয়া যাবে। মানুষ বাঁচে স্মৃতি নিয়ে। যে স্মৃতি তাঁকে একাকিত্বের সাগরে ডুবিয়ে রাখে। প্রতিটি মানুষই আসলে নিজের কাছে একা। বড় একা। এ একাকিত্বের ফাঁদে পড়ে প্রতিটি মানুষই জীবনের কাছে অসহায় হয়ে পড়ে।

এমনই সব অনুভূতি উঠে আসে আহমাদ মোস্তফা কামালের গল্পগ্রন্থ ‘একলা থাকার গল্প’ বইয়ে। Continue reading

সালাহ উদ্দিন শুভ্রর “মানবসঙ্গবিরল” :: সঙ্গহীনতা অথবা সঙ্গ-হারাবার গল্প

ভূমিকা২০০৯ সালের দিকের কথা। মাহবুব ভাই (মাহবুব মোর্শেদ) তখন প্রথমআলো ব্লগ ছেড়ে সমকালে চলে গেলেন। ব্লগের জন্মলগ্ন থেকে জড়িত বলে কষ্ট লাগছিল। একদিন মাহবুব ভাইরে বললাম, মাহবুব ভাই, নিজের হাতে গড়া ব্লগটারে ছাইড়া আপনে থাকবেন কেমনে? মাহবুব ভাই চুপ  ছিল। কিছু বলেনি । যাই-হোক। এরপর একদিন মাহবুব ভাই ফোন দিয়ে বলল, নতুন মডারেটরের সাথে একটু দেখা করেন। নাম হইল শুভ্র। গেলাম প্রথম আলো অফিসে। দেখা হইল নতুন মডারেটরের সাথে। কথা হইল। একদম ধীরস্থীর। চুপচাপ। ভাবনায় যেন ডুইবা থাকে। নাম বলল- সালাহ উদ্দিন শুভ্র। শান্ত স্বভাবের এই মানুষটা নাকি প্রগতিশীল রাজনীতির সাথেও যুক্ত ছিল। অবাক কাণ্ড!

বই : মানবসঙ্গবিরল, লেখক : সালাহ উদ্দিন শুভ্র, ধরন : গল্পগ্রন্থ, প্রকাশক : ভাষাচিত্র,

প্রচ্ছদ : সব্যসাচী হাজরা, দাম-১১০ টাকা, পৃষ্ঠা-৮০, প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি ২০১১

মানবের সঙ্গ কোথায়? কতদূর যাবে মানুষ? সঙ্গে যাবে কে? মানবের সঙ্গী আছে কি? এত প্রশ্নের বেড়াজালে পড়তেই হবে সালাহ উদ্দিন শুভ্র’র প্রথম গল্পগ্রন্থের নাম “মানবসঙ্গবিরল” পড়ার পর। মানবের সঙ্গ আসলেই বিরল। এটাই প্রথম গল্পগ্রন্থ সালাহ উদ্দিন শুভ্র’র। Continue reading

আহমাদ মোস্তফা কামালের “অশ্রু ও রক্তপাতের গল্প” এবং মানব চরিত্রের জটিলতা

ভূমিকা: আহমাদ মোস্তফা কামাল আমার শিক্ষক। পরে আমার পছন্দের লেখক। তার সঙ্গে পরিচয় ক্লাসরুমে। এসেই বলেছিলেন, “আই অ্যাম দ্য গড অব দিজ ক্লাস।” ভয়ে কুঁকড়ে যাওয়া অবস্থা। গম্ভীর স্বভাবের মানুষটি যে একজন লেখক তখনও জানতাম না। তার পরের বছরই জেনেছি স্যার লেখক। তখন অবশ্য সাহিত্য জগতের খুব একটা খোঁজ আমি রাখি না। তাই জানা হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে জ্ঞান চর্চা ও জানার জায়গা। আমি সে জায়গায় জেনেছি। চিনেছি। শিখেছি। তা দিয়েই এখন পেট চালাতে পারি। 

স্যারের সঙ্গে কীভাবে যেন অন্যরকম সম্পর্ক তৈরি হলো। তা কীভাবে হলো নিজেও জানি না। মজার বিষয় ছিল, যখন তিনি আমার কোনো ক্লাস নিতেন সেই সেমিস্টারে তিনি তার রুমের আশেপাশে আমাকে দেখলেই বলে উঠতেন, কি চাও? একদিন ডেকে বললেন, যখন কোর্স করবা তখন তোমাকে আমি চিনি না।”

সম্পর্ক ক্লাসে নাই বুঝলাম। কিন্তু কোর্স চলাকালীন সময়েও নাই! সময় যেতে যেতে চলেই গেল। তিনি যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, আমি এখন সেই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছোটখাটো চাকরি করি। এখনও আমি তার কাছে ছাত্রই। এটাই পৃথিবীর সেরা পরিচয়। 

এবছরের বই মেলায় স্যার একজন তরুণ গল্পকারকে আমার বই দেখিয়ে বলছিলেন, এটা হচ্ছে আরেকজন তরুণ লেখকের প্রথম বই।” আমি তখন একটু দূরে দাঁড়িয়ে দেখছি। সেই গল্পকার বলছেন, হ্যা চিনি। এখন আপনার কলিগ।”
স্যার খেপে বললেন, সেটা অনেক পরের হিসাব। সে আমার ছাত্র।

চিরজীবন আমি ছাত্র হয়েই থাকতে চাই। ছাত্র হলেই অধিকার থাকে। অধিকার নিয়ে আব্দার করা যায়। স্নেহ পাওয়া যায়। কাছে যাওয়া যায়। অন্য কোনো পরিচয়ে সেটা সম্ভব না। সম্ভব হলেও ছাত্রের চেয়ে ক্ষমতা অন্য কোনো পরিচয়ে থাকে না। মাঝে মাঝে তিনি আমাকে ধমকান। ধমকে সুখও আছে। মনে হয়, ধমকেও ভালোবাসা লেপটে আছে।

আমার প্রথম বই তাঁকে উসর্গ করেছিলাম। এ দেখে তিনি বললেন, “প্রথম বই বাবা-মাকে উসর্গ করতে হয়।” আমি মিষ্টি করে হেসেছি। কিছু বলিনি। যা বলার কওয়ার তা আমার মনকে বহু আগেই বলে রেখেছি। মা-বাবা তো একটি মানব সন্তান জন্ম দেয়। একটি দেহ ভূ-জগতে নিয়ে আসে। কিন্তু সেই দেহে প্রাণ দেয় শিক্ষক।

 

 

বই : অশ্রু ও রক্তপাতের গল্প 

লেখক : আহমাদ মোস্তফা কামাল
ধরন : গল্পগ্রন্থ, প্রকাশক-শুদ্ধস্বর, প্রচ্ছদ-শিবু কুমার শীল, দাম- ১৭৫ টাকা, প্রকাশকাল:ফেব্রুয়ারি ২০১১
Continue reading

আপসের গল্পগুলো

শিপ্রার শহরে কয়েকজন এজেন্ট‘লাইফ ইজ ফুল অব কমপ্রোমাইজেস’। যে গল্পের শুরুতেই আপসের কথা চলে আসে, সে গল্পের লেখক যে জীবনকে আপস হিসেবেই দেখেন তাতে কোনো সন্দেহ থাকে না।

শহুরে ক্লান্তি ও গ্লানিতে ভাসতে থাকা বন্ধুরা মাঝে মাঝে একত্রে আড্ডা দেয়। সে আড্ডায় আবুল বাশার বলা শুরু করে তার জীবনের কোনো এককালে ঘটে যাওয়া ঘটনা। যে ঘটনায় উঠে আসে ওপারের সঙ্গে এপারের মানুষের সম্পর্ক। যে সম্পর্কটাই অপরাধের। ভারতীয় বর্ডার ঘেষা গ্রামের মানুষের পেশাই স্মাগলিং। সভ্য বন্ধুদের সামনে নতুন পরিচয়ে নিজেকে পরিচয় করায় বাশার। সেখানেই হতাশার গল্প শেষ নয়। রানি নামে এক হিন্দু মেয়ের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে যাওয়ার গল্পও উঠে আসে। যে সম্পর্কে প্রেম কিংবা যৌনতার আকর্ষণ বুঝে ওঠার আগেই আসবে বিএসএফ। জীবন ও প্রেমের মাঝকানে প্রেমকে ত্যাগ করে বাশার পালিয়ে আসে সেই মেয়েটিকে একা ফেলে। হয়ত গল্পটি সেখানেই শেষ। কিংবা শুরুও হয়নি। বন্ধুদের আড্ডায় নীরবতায় বাশার কাঁদে। যেখানে একদিন সে কম্প্রমাইজ করেছিল। জীবনের সঙ্গে প্রেমের আপস হয়েছিল। যে আপসে আছে ব্যথা কিংবা বেদনা অথবা অপরাধবোধ। যা আজও বাশার বয়ে বেড়ায়। Continue reading