প্রয়োজন একজন নেতা: অধ্যাপক মঈনউদ্দিন

আশা ইউনিভার্সিটি শ্যামলীতে বিশাল বিল্ডিং নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমার বাসার কাছেই। প্রতিদিন যাই আর হা করে তাকিয়ে বিল্ডিংটা দেখি। একদিন ভাবলাম ভেতরে যাওয়া উচিত। গেলাম। ঘুরলাম। আরেকদিন ভাবলাম এই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সঙ্গে একটু কথা বললে খারাপ হয় না। কথা বললাম। শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে আমার আগ্রহের শেষ নেই। সেই বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলতে গেলাম।

লোকটা এতো অমায়িক যে ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। শুরুতে আমাকে “আপনি” করে বলছিলেন। হুট করেই বললেন, “তোমাকে  ‘তুমি’ করে বলতে চাই। কারণ অপরিচিত কাউকে যদি আমার ভালো লাগে তখন তাকে আমি তুমি করে বলি। ” আমি বললাম, “স্যার আপনি আমাকে তুই করেও বলতে পারেন। কারণ, যাদের আমার ভালো লাগে তারা আমাকে তুই বললে খুব ভালো লাগে।” উনি মুচকি হাসলেন। আমিও মুচকি হাসলাম। তারপর আবার কথার ভেতর চলে গেলাম।  

————————-

অধ্যাপক মো: মঈনউদ্দিন খান আশা ইউনিভার্সিটির প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য। তিনি তার ৪০ বছরের শিক্ষকতা জীবনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যায়ের বিজনেস স্টাডিজের ডিন, একাউন্টিং এবং ইনফরমেশন সিস্টেম বিভাগের চেয়ারম্যান এবং সাউথ ইস্ট ইউনিভার্সিটির উপ-উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। অধ্যাপক মঈনউদ্দিন খান ২০০৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে শিল্প, বিজ্ঞান ও তথ্য প্রযুক্তি এবং পাট ও বস্ত্র মন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর হাত ধরেই আশা ইউনিভার্সিটি এগিয়ে চলছে সফলতার সঙ্গে।

অনেকেই বলছে স্কুল পর্যায়ের তিনটি স্তরে পাবলিক পরীক্ষা শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার বাড়াবে। এ বিষয়ে আপনি কী মনে করেন?

বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার নতুন পদ্ধতি একটা এক্সপেরিমেন্ট। আমি মনে করি যত বেশি পাবলিক পরীক্ষা হবে, এক প্রশ্নে যত বেশি পরীক্ষা নেওয়া যাবে; শিক্ষার মান তত বেশি ভালো হবে।

আর ঝরে পড়ার বিষয়টা নিয়ে বলতে হয়, আগে একসঙ্গে ঝরে যেত। এখন বিভিন্ন ধাপে এসে ঝরে পড়ছে। আবার অনেক সময় ভয়ে পড়াশোনা থেকে অনেকেই দূরে সরে যাচ্ছে। শুধু পরীক্ষায় খারাপ করলেই পড়াশোনা থেকে ছাত্র-ছাত্রীরা দূরে সরে যায় তাও সঠিক না। আমি অনেক সময়ে দেখেছি একজন ছাত্র চিন্তা করে দেখল তাকে দিয়ে পড়াশোনা হবে না। তখন সে পড়াশোনা ছেড়ে দেয়। যা খুবই দুঃখজনক।

আমার অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি যে, স্কুলে যে সব শিক্ষার্থী ঠিক মতো পড়াশোনা করে না। মনোযোগ নেই। তারাই শেষ পর্যন্ত ছিটকে যায়। একবার যদি কেউ ছিটকে যায় তাকে ফিরিয়ে আনাটাও খুব কঠিন।

তবে বর্তমান এডুকেশন সিস্টেমটা মাত্র শুরু হলো। ধীরে ধীরে এটার ভালো-খারাপ দিক বেরিয়ে আসবে। খারাপ দিকগুলো ডেভেলপ করতে হলে যা যা করা দরকার আশা করি সরকার সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবেন। তবে এখনো এই সিস্টেমটিকে নিয়ে কথা বলার সময় হয়নি।

এবার একধাপে বিশ্ববিদ্যালয় প্রসঙ্গে আসি। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে দেখা যায় নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ের উপর পড়াশোনা করায়। এমনটা কেন হয়? যেখানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বহু বিষয়ের উপর ডিগ্রি দিচ্ছে।

প্রথম কথা হচ্ছে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বয়স কত? বিশ বছরও হয়নি বলতে গেলে। অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বয়স ৯০ বছর। তারা তো একসঙ্গে এতোগুলো বিষয়ের উপর ডিগ্রি চালু করেনি। ধীরে ধীরে এগিয়েছে।

এছাড়াও মনে রাখা উচিত যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সরকারের কোনো সহযোগিতা পায় না। নিজস্ব অর্থায়নেই আমাদের চলতে হয়। আবার সরকার এখন সবাইকে বাধ্য করছে স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মার্ণের জন্য। পাঁচ বছরের মধ্যে প্রতিটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে জমি কিনে স্থায়ী ক্যাম্পাসে যেতে হবে।

আশা ইউনিভার্সিটি কী নিজস্ব জমি কিনেছে?

আশা ইউনিভার্সিটি আশুলিয়াতে জমি কিনেছে। সাড়ে ছয় বিঘা জমির উপর হবে আশা ইউনিভার্সিটি। সেখানে আমরা আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করবো। যদিও বর্তমানের শ্যামলীর ক্যাম্পাসটিও থাকবে। কারণ ইভিনিং কোর্সগুলো শিক্ষার্থীরা আশুলিয়া গিয়ে করতে পারবে না। যারা চাকরি করার পাশাপাশি এমবিএ করে; তাদের জন্য এটা খুবই কঠিন হয়ে পড়বে। তাদের কথা চিন্তা করেই শ্যামলীর ক্যাম্পাসটি আমরা রেখে দিবো। স্নাতক পর্যায়ের প্রোগ্রামগুলো স্থায়ী ক্যাম্পাসেই হবে। আমরা ছাত্রদের জন্য আলাদা হোস্টেল এবং ছাত্রীদের জন্য আলাদা হোস্টেল তৈরি করবো। আবাসিক সব সুযোগ সুবিধা আশা ইউনিভার্সিটি দেবে।

আপনি তো এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য। আশা ইউনিভার্সিটি বিষয়ে অভিমত কি?

আশা ইউনিভার্সিটি চেষ্টা করে শিক্ষার মান ধরে রাখতে। ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থী নেওয়া হয়। আমাদের ১শ জন স্থায়ী শিক্ষক আছে। যেটা অনেক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সহজে দেখা যায় না। আমরা ২০০৭ সালের মে মাসে তিনটি বিভাগ দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলাম। আপনি শুনলে আবাক হবেন প্রথম সেমিস্টারেই আমরা ৭৭১ জন শিক্ষার্থী পাই। অন্যদিকে এখন আমাদের ছয়টি বিভাগ। এটা একটা ইতিহাস। আমার জানা মতে এমন কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নেই যেখানে প্রথম ব্যাচেই এতজন শিক্ষার্থী পেয়েছে। এজন্য অবশ্য ‘আশা’-কে ধন্যবাদ দিতে হয়। আপনি জানেন ‘আশা’ অনেক নামকরা এনজিও। সমাজে তাদের একটি সুনাম আছে। সে পথ ধরেই আশা বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফি নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে। 

আমরা দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দিয়ে থাকি। এ পর্যন্ত সাড়ে ছয় কোটি টাকা দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে। আপনি কখনো শুনেছেন, টিউশন ফি কমাতে? আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কী তাদের টিউশন ফি কমিয়েছে? কিন্তু আশা ইউনিভার্সিটি সেই নজির তৈরি করেছে। আমরা দুটি প্রোগ্রেমের ফি কমিয়ে দিয়েছি। আমরা যখনই টিউশন ফি কমিয়ে দিলাম তখনই উক্ত বিষয়ে সাইত্রিশ জন শিক্ষার্থী পেলাম। সুতরাং আশা ইউনিভার্সিটি সম্পর্কে এমন অভিযোগ ধপে টিকবে না।

এবার একটু ভিন্ন প্রসঙ্গে আসি। আপনার দৃষ্টিতে একজন ছাত্রের জীবন কেমন হওয়া উচিত?

শুধু পড়াশোনা করলেই হবে না। প্রতিটি ছাত্রকে আলোকিত মানুষ হতে হবে। স্বাধীনতার পর থেকে এতগুলো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কত হাজার ছাত্র-ছাত্রী বের হয়েছে। সবাই কী আলোকিত মানুষ হতে পেরেছে? অবশ্যই হতে পারেনি। যদি সবাই আলোকিত মানুষ হতো তাহলে তো দেশের আজ এই পরিস্থিতি হতো না। তবে খুব যে হতাশাব্যঞ্জক তাও না। শিক্ষা যদি আমাদের জাতি না পেত তবে তো ক্ষুদ্র উন্নতির ছোঁয়া পাওয়াও সম্ভব হতো না। তাই হতাশ হওয়ার কিছু নেই। ভালো-খারাপ যাইহোক; শিক্ষার তো বিকল্প নেই। শিক্ষা তো জাতির মেরুদন্ড। এটার উপর ভর করেই যতটুকু এগিয়ে যাওয়া যায়।

তাহলে শিক্ষা আলোকিত হওয়ার জায়গা তৈরি করতে পারছে না?

আমি কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার কথা বলেছি। শিক্ষা মানেই স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় না। শিক্ষা পাওয়ার সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান হচ্ছে পরিবার। পরিবারগুলো এখন দূর্বল হয়ে গেছে। ছোটবেলায় দেখতাম, ছোটরা বড়দের কথা শুনতো। এখনতো সেটা দেখা যায় না। সবাই এখন নিজের মত করেই চলতে চায়। পারিবারিক সিস্টেমটি দূর্বল হয়ে পড়েছে।

এছাড়াও রাজনৈতিক দর্শনের মধ্যেও অনেক পরিবর্তন আনা দরকার। রাজনীতিতে সুবিধাবাদিদের দৌরাত্ব দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। যখন একজন ছাত্র দেখবে রাজনীতিতে গেলে অন্যপন্থায় সুবিধা পাওয়া যাবে; তখন তো স্বাভাবিকভাবেই পড়াশোনার প্রতি সবার আগ্রহ কমে যাবে। তাই এই সুবিধাবাদি দর্শন বন্ধ করতে হবে।

শেষ প্রশ্ন, আমাদের নতুন প্রজন্মের মধ্যে আপনি কী কোনো সম্ভাবনা দেখতে পান?

আমাদের দেশের উন্নতির জন্য যা যা প্রয়োজন তার সবকিছুই আমাদের দেশে আছে। আমাদের নতুনদের মধ্যে সব শক্তি আমি দেখতে পাই। অনেকে বলে আমাদের জনসংখ্যা হলো প্রধান সমস্যা। কিন্তু আমার কাছে এটা জনশক্তি। সমস্যা হিসেবে নয়; জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত। দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে মনোনিবেশ করা উচিত। সত্যি কথা বলতে কী, আমাদের সব কিছুই আছে। শুধু দরকার নেতৃত্ব। আমাদের মহাথীর মোহাম্মদ দরকার। তার মতো একজন নেতা দরকার। একজন সৎ নেতা আমাদের দেশটাকে পাল্টে দিতে পারবে বলে আমি মনে করি। নতুনদের মধ্যেই হয়ত লুকিয়ে আছে মাহাথীর মোহাম্মদ।