দক্ষতাই নেতৃত্বের শক্তি: ইজাজ

বাংলাদেশে নেতৃত্বের অভাব। এ নিয়ে আমরা কথা বলি। আলোচনাও করি। কিন্তু কখনো শুনতে পাইনি কেউ নেতৃত্ব তৈরিতে কাজ করে। বেশ কয়েক মাস আগে জানতে পারি বাংলাদেশে একটি মাত্র প্রতিষ্ঠান যারা নেতৃত্ব তৈরিতে কাজ করে যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির নাম বাংলাদেশ ইয়ুথ লিডারশিপ সেন্টার। তবে নেতৃত্ব মানেই রাজনৈতিক নেতৃত্ব নয়। দেশকে গড়তে হলে নিজের জায়গা থেকেই গড়া যায়। এমনটাই মনে করে বাংলাদেশ ইয়ুথ লিডারশিপ সেন্টার।

হার্ভার্ড থেকে পড়াশোনা শেষ করা ইজাজ আহমেদ এই প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। তার হাত ধরেই ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ ইয়ুথ লিডারশিপ সেন্টার। তার সংগ্রাম চলছে দেশের তরুণদের দক্ষ করে গড়ে তোলার। মেধাবী ইজাজ তার নিজস্ব অফিসে কথা বলেছেন সময় নিয়ে। জানিয়েছেন তার স্বপ্নের কথা। বলেছেন কেন তিনি এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুললেন।

আমরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কথা শুনতে পাইকিন্তু নেতৃত্ব তৈরির করার প্রতিষ্ঠান এটিই প্রথমএমন একটি উদ্যোগের ভাবনা কিভাবে আসলো? 

কলেজের পড়াশোনা শেষ হওয়ার পর বাবা প্রশ্ন করলেন, কী হতে চাই? ভাবলাম অর্থনীতিবিদ হবো। তাই ইকনোমিক্স পড়তে হবে। খোঁজ খবর নিয়ে গেলাম স্কটল্যান্ডের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন অ্যাকটিভিটিজের সঙ্গে জড়িত ছিলাম। খুব সক্রিয়ভাবে স্টুডেন্ট পলিটিক্স করতাম। আমার যখন বিশবছর বয়স তখনই আমি স্কটল্যান্ড থেকে মানুষের সহযোগিতা নিয়ে রোটারি ক্লাবের কাজের অংশ হিসেবে গ্রামের বাড়িতে অসহায় মানুষের জন্য স্কুল উন্নয়নে সাহায্য করেছি।

সে সময়গুলোতে ইচ্ছা ছিল, উৎসাহ ছিল। কিন্তু প্ল্যান করে কিছু হয়নি। এরপর যখন পড়াশোনা শেষ হয় তখন জীবনের একটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আসে। সেটা হলো, আমি কী বিদেশেই থেকে যাবো নাকি বাংলাদেশে ফেরত আসবো।  তখন বাবার কথা মনে পড়ে গেল। আমার বাবা-চাচা মুক্তিযোদ্ধা। তারা এ দেশটাকে স্বাধীন করেছেন। এই একটি প্রেরণা নিয়েই আমি দেশে ফিরে আসি। উদ্দেশ্য একটাই। আমি নিজের দেশের জন্য কিছু করবো।

দেশে এসে মাত্র ১০ হাজার টাকা দিয়ে আমি কাজ শুরু করি ড. আতিউর রহমানের সঙ্গে। তার সঙ্গে বিশ্বব্যাংক এবং ইউএনডিপির বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ করি।

আমি যখন নানান প্রকল্পে কাজ শুরু করি তখন আমি উপলব্ধি করি বাংলাদেশে টাকার কোনো সমস্যা নেই। সমস্যা হলো আমাদের মানসিকতায়। তখনই মনে হয়েছে এ দেশে নেতৃত্বের একটা বড় পরিবর্তন প্রয়োজন। নেতৃত্বের পরিবর্তন মানেই রাজনৈতিক পরিবর্তন সেটা কিন্তু না। নেতৃত্ব মানে হলো, আমি ব্যক্তিগতভাবে সমাজে একটা পরিবর্তন নিয়ে আসবো। সবাইকে নিয়ে সমাজের সেই পরিবর্তনে কাজ করতে হবে।

আমার প্রশ্নটা ছিল, ঠিক কখন আপনি তরুণ প্রজন্ম নিয়ে কাজ করার কথা ভাবেন?

প্রকল্পগুলোতে কাজ করতে গিয়ে জীবন সম্পর্কে আমার ভাবনা আসে; তখনই চিন্তা করি তরুণ প্রজন্মকে নিয়ে কাজ করবো। কারণ, এতো কম বয়সে যদি আমি বড়দের বোঝাতে চাই তখন ব্যাপারটি ভালো ঠেকবে না। সেজন্যই ভাবলাম যদি ভবিষ্যত প্রজন্মকে সঠিকভাবে গড়ে তুলতে পারি তাহলেই দেশে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসবে।

লিডারশিপ বিষয়ে পড়াশোনা করতে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যানসেটা কখন? 

যখনই ভাবি আমি তরুণ নেতৃত্ব তৈরিতে কাজ করবো তখনই হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে লিডারশিপ নিয়ে পড়াশোনা করতে চলে যাই। কারণ দেশে লিডাশিপ নিয়ে একটি সেন্টার গড়ে তোলার কথা ভাবতে থাকি। সেজন্য পড়াশোনার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি।

ভাবনাটি বাস্তবে কীভাবে নিয়ে আসলেন? 

ভাবলেই তো হয় না। নতুন ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়ালো অর্থ। যা কিছুই করতে যাই না কেন আমার প্রয়োজন অর্থ। তারপর আমি ও আমার বন্ধু এমআইটি থেকে একটি অ্যাওয়ার্ড পাই। সেখানে দশ হাজার ডলার পুরস্কার হিসেবে পাই। এ অর্থ দিয়েই কাজ শুরু করি।

যখনই নেতৃত্ব নিয়ে কাজ করার প্রসঙ্গ আসলো তখন আমি ভাবলাম তিনটি মাধ্যম নিয়ে কাজ করার। মানে হলো, স্কুলের বাংলা মাধ্যম, ইংরেজি মাধ্যম এবং মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের একসঙ্গে নিয়ে আসার কথা। আমি ও আমার বন্ধু ২০০৮ সালে দশ হাজার ডলার নিয়ে বাংলাদেশে চলে আসি।

দেশে এসে নতুন সমস্যায় পড়তে হলো। যে বন্ধু আমার সঙ্গে ফিরে আসে সে বলল, ইজাজ তোমাকে প্রজেক্ট করতে হলে চট্টগ্রামে করতে হবে। কারণ আমার বাবা-মা দুজনই চট্টগ্রামে। তাই আমাদের প্রথম প্রজেক্টের কাজটি শুরু হয় চট্টগ্রাম থেকে। বিভিন্ন স্কুল থেকে মেধাবী ছেলেমেয়ে নিয়ে এসে এক মাসের লিডারশিপ ট্রেনিং হলো।

চট্টগ্রামের প্রজেক্ট শেষে যখন ঢাকায় ফিরি তখন আমি শুধুমাত্র কিছু কাগজ নিয়ে ফিরি। কারণ সব টাকা শেষ। টাকা শেষ হলেও বাবা মার ঘরের আমার ছোট্ট রুমটিতেই বাংলাদেশ ইয়ুথ লিডারশিপ সেন্টারের যাত্রা শুরু হলো। তখন সারাদিন আমি বিভিন্ন মানুষকে শুধু ইমেইল করতাম। সাহায্যের জন্য ইমেইল করতাম। বহুলোকের কাছে ইমেইলে বলেছি, আমি একটি সংগঠন করতে চাই। সবাই যেন আমার পাশে থাকে সেটা নিয়েও কথা হয়। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে বলতে হয় কেউ তখন আমার কথা বিশ্বাস করতো না।

যে কোন প্রতিষ্ঠান করতে গেলে নিবন্ধনের প্রয়োজন আছেসেটা কীভাবে করলেন?

নিবন্ধনের আগে প্রয়োজন সাতজন বোর্ড মেম্বার। অনেক মানুষকে আমি বুঝিয়েছি কিন্তু কেউ তখন রাজি হয় না। আমি গিয়ে বলি, একটি সংগঠন করতে চাই, আমি পাইলট প্রজেক্ট করেছি; সঙ্গে আমার একাডেমিক কাগজপত্রও নিয়ে যাই। অনেক লোক তখন আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছে। পরে সাতজন বোর্ড মেম্বার আমি পেলাম। ২০০৯ সালের জানুয়ারি আমাদের প্রতিষ্ঠান রেজিস্ট্রেশন পায়।

অর্থের বিষয়ে ফেরত আসিদেশের কারো কাছে শুরুতে সাহায্য পাননি বলেছেনপরের পথচলার বিষয়ে বলুন 

যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে এক অনুষ্ঠানে দেখা হয়। তাকে আমি সবকিছু বলি। আমার লক্ষ্য উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানাই। তিনি তখন বললেন, আমরা তোমাকে ১৬ হাজার ডলার দেবো। শুরু করলাম সংগঠনের কাজ। কিন্তু এই অর্থ যদি অফিস ভাড়া করে খরচ করি তাহলে তো সংগঠন চালানো সম্ভব হবে না। তাই আমার ঘরেই একটি রুমে অফিস কক্ষ বানাই। দুজন সহযোগী নিলাম। পার্ট টাইম হিসেবে নেই। অল্প বেতনে কাজ করানো শুরু করি। আর নিজের কোন বেতন নেই। পরের তিনটি বছর আমার বাসার সেই অফিস থেকেই বাংলাদেশ ইয়ুথ লিডারশিপ সেন্টারের এগিয়ে যাওয়ার কাজ চলে।

এখন বারিধারার পাশে নতুন বাজারের যেই অফিসটি আপনি দেখতে পাচ্ছেন এটা দিয়েছেন কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা। তারা আমাকে বলে, তোমাকে আমরা অনেকদিন ধরে দেখছি নেতৃত্ব নিয়ে কাজ করছো। এখন  থেকে এই বিল্ডিংয়ে তুমি কাজ শুরু করতে পারো। আমরা তোমাকে সহযোগিতা করবো।

এরপর একদিন দেখা হয় আবেদ স্যারের সঙ্গে। তিনি আমাকে বললেন, তোমার মত বয়সে আমিও বাড়ি বিক্রি করে কাজ শুরু করেছিলাম। তিনি তখন নিজ উদ্যোগে ব্র্যাকের সৌজন্যে আমাদের অফিসটি গুছিয়ে দেন। এটাই হলো আমাদের ইতিহাস।

এবার বাংলাদেশ ইয়ুথ লিডারশিপ সেন্টারের কোর্স নিয়ে বলুন 

আমাদের চারমাসব্যাপী প্রোগ্রাম করি । শিক্ষার্থীরা প্রথম ছয়সপ্তাহ ক্লাসে লিডারশিপ ট্রেনিং নেয়। তারপর আড়াই মাস তারা কমিউনিটিতে গিয়ে কাজ করছে। তবে এটি কিন্তু কমিউনিটি সার্ভিস কোন ক্লাব না।

আমাদের শিক্ষার্থীদের বলি, তোমার নিজের জন্য তোমাকে দাঁড়াতে হবে। নিজেকে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। এজন্য যা যা গুণাবলী প্রয়োজন তার সবকিছুই বাংলাদেশ ইয়ুথ লিডারশিপ সেন্টার তোমাকে দিচ্ছে। ভালো কীভাবে করতে হয়, কীভাবে কাজ করতে হয়, কীভাবে কথা বলতে হয়, কীভাবে লিখতে হয় তার সবকিছুই আমরা পড়াই। প্রতিটি সমস্যা কীভাবে সমাধান করা যায় সে বিষয়ে ট্রেনিং দেওয়া হয়। আর কমিউনিটিতে কাজ করার পর প্রতিটি ছেলেমেয়ের মধ্যেই একটা সহানুভূতি চলে আসে। এটাই আমাদের উদ্দেশ্য ছিল।

আপনি তিন মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের একসঙ্গে নিয়ে প্রোগ্রাম পরিচালন করেনমূল উদ্দেশ্য কী?

যেহেতু তিনটি মাধ্যমের ছেলেমেয়ে নিয়ে কাজ করি সুতরাং আমরা বোঝার চেষ্টা করি কার ধৈর্য্য শক্তি কেমন। অনেক সময়ে দেখা যায় মাদ্রাসার ছেলেটার সঙ্গে ইংরেজি মাধ্যমের একটি ছেলে মিশতে পারছে না। তখন সে ওই প্রোগ্রাম থেকে ছিটকে যায়। অনেকে আবার ধীরে ধীরে খাপ খাইয়ে নেয়। সেটাও পজিটিভ। কারণ দেশ গড়তে হলে সবাইকে মিলে গড়তে হবে। এখানে বাংলা, ইংরেজি, মাদ্রাসা বলে কিছু নেই। সবাই সবার জায়গা থেকে যাতে ভাবতে শেখে সেটাই আমাদের উদ্দেশ্য।

আপনাদের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা তো মূল শিক্ষার বাইরের একটি ব্যবস্থাসেখানে কী সবার ক্লাস টাইম নিয়ে সমস্যা পড়তে হয় না? 

হ্যাঁ হয়। আমরা শুরুতেই বলে দেই, তোমার যদি বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজে ক্লাস থাকে তবে এসো না। আমাদের ক্লাস শুরু হয় বিকেল তিনটা থেকে। সে সময় থেকে যারা পারবে তারাই আমাদের ক্লাসে আসে। প্রথম ছয় সপ্তাহ ক্লাস হয়। সেটা হয় সপ্তাহে পাঁচদিন করে। তারপর আড়াইমাস কমিউনিটিতে গিয়ে শুক্রবার ও শনিবার গিয়ে কাজ করে।

কমিউনিটিতে গিয়ে কী করে?

কমিউনিটিতে গিয়ে কাজ করা মানে কিন্তু কম্বল বিলানো না। কমিউনিটিতে গিয়ে শিক্ষার্থীরা সেখানকার সমস্যাগুলো চিহ্নিত করবে। সেটা কিভাবে সমাধান করা যায় সেটাও বের করতে হবে। পুরো প্রক্রিয়াটা নিয়ে তারা ক্লাসে এসে প্রেজেন্টেশন দেবে।

অনেকেই বলে তরুণ প্রজন্ম হতাশার দিকে যাচ্ছেতারা প্রযুক্তিগতভাবে এগিয়ে আছে বলে সবসময় আত্মকেন্দ্রিকই থেকে যাচ্ছেসেখানে যখন হতাশার প্রসঙ্গ আসছে তখন নেতৃত্ব বিষয়ে তারা কতটা সচেতন?

না হতাশাটা সবার ক্ষেত্রে নয়। তবে এটাও ঠিক হতাশাগ্রস্থ অনেকেই আছে। এ জন্য দক্ষ হতে হবে। হতাশা দূর হতে পারে দক্ষতা অর্জনের মধ্যে দিয়ে। নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে। ক্যারিয়ারের যে কোনো পর্যায়ের জন্য নিজেকে তৈরি করতে হবে। আত্মবিশ্বাসটা দরকার। সবচেয়ে বড় বিষয় শেখার ইচ্ছা। তবে সত্যি কথা হলো, হতাশা হলো চায়ের দোকানে। জীবনের সব হায় হতাশা হলো ওই দোকানে বসে। কিন্তু দোকানে বসে চাকরী নেই, রেজাল্ট ভালো হয় না, বিদেশ যেতে পারি না এসব বলে লাভ নেই। চেষ্টা করতে হবে। এগিয়ে যাওয়ার শক্তি আপনি দক্ষতা দিয়েই পাবেন। দক্ষ জাতি নেতৃত্ব তৈরি করবে।