প্রতিটি নারীর জীবন এখনও ‘আন্ডার কনস্ট্রাকশন’

আন্ডার কন্সট্রাকশানক্যামেরা যখন নারীর দিকে:

বিশ্বব্যাপী নির্মিত ছবিগুলোতে নারীর প্রকৃত অবয়ব যেন অনেকটা আড়ালেই থেকে যায়। তার সংগ্রাম, চিন্তার গভীরতার চেয়ে স্ক্রিনে উঠে আসে তার গ্ল্যামার। অথচ নারীর যে আরও বহু পরিচয় আছে, সে গল্প বলবে কে? নারীর সেসব বয়ান নিয়েই হাজির হয়েছেন রুবাইয়াত হোসেন। অধিকাংশ চলচ্চিত্রে যেমন পরিচালকের ক্যামেরা থাকে পুরুষের ওপর। নারীর ভাবনা, তার সংগ্রামের চিত্র উঠেই আসে না। সেখানে রুবাইয়াত নিলেন ইউটার্ন। তিনি ঘরের সেই নারীর দিকেই ক্যামেরা ধরলেন। আবিষ্কার করে দেখার চেষ্টা করলেন নারীর পরিচয়। যেন সারাক্ষণ তার প্রশ্ন, নারী তুমি কে? কি চাও তুমি?

মন্ট্রিয়াল বিশ্ব চলচ্চিত্র উৎসব, স্টকহোম চলচ্চিত্র উৎসবসহ আন্তর্জাতিক বেশ কয়েকটি উৎসব মাতিয়ে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশে ২০১৬ সালে মুক্তি পেয়েছিল রুবাইয়াত হোসেন নির্মিত দ্বিতীয় ছবি ‘আন্ডার কনস্ট্রাকশন’। রুবাইয়াতের প্রথম ছবি ছিল ‘মেহেরজান’। তখন চলচ্চিত্রটি ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়, যার ফলে প্রেক্ষাগৃহ থেকে নামিয়ে ফেলতে বাধ্য হন পরিচালক। বলিউডের জনপ্রিয় অভিনেত্রী জয়া বচ্চনসহ দেশের অনেক নামকরা শিল্পী থাকা স্বত্ত্বেও ২০১১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘মেহেরজান’ তার যাত্রা চালু রাখতে পারেনি। এরপর লম্বা সময় পর রুবাইয়াত আবারও হাজির হলেন তার নির্মিত দ্বিতীয় ছবি ‘আন্ডার কনস্ট্রাকশন’ নিয়ে।

‘আন্ডার কনস্ট্রাকশন’ চলেছে তিনটি নারী চরিত্রকে কেন্দ্র করে। মূল চরিত্রে রয়া। সে বিবাহিত। স্বামী একজন আর্কিটেক্ট, উচ্চমধ্যবিত্তই বলা চলে। অথচ সে উঠে এসেছে নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে। নিজের ভাগ্য যেন রয়া ফিরিয়ে নিয়েছে ভালো চাকরি করা স্বামীর যোগ্যতায়! রয়া একজন থিয়েটারকর্মী। প্রায় ১২ বছর ধরে রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’ নাটকে নন্দিনী চরিত্রে অভিনয় করে যাচ্ছে। বয়স বেড়ে যাচ্ছে রয়ার। আর এজন্য নন্দিনী চরিত্রে এখন নতুন এক তরুণীকে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে তার গ্রুপে। দ্বিতীয় নারী চরিত্রটি হলো রয়ার মা। তিনি স্বাবলম্বি। ধর্মীয় অনুভূতিপ্রবল এই বয়স্ক নারী অত্যন্ত শক্ত মনের অধিকারী। তার চরিত্রদের সোজা-সাপ্টা কথা দর্শককে আলোড়িত করবে। বিশেষ করে যখন রয়ার সঙ্গে তার কথপোকথন হয় সন্তান নেওয়ার বিষয়। রয়া তখন বলে, ‘তোমার কাছে তো বিয়ে মানে বাচ্চা পয়দা করা’। তখন কঠিন বাস্তবটি রয়াকে মুখের ওপর ছুড়ে দেয় তার মা। তিনি বলে ওঠেন, ‘আমি স্বামীর টাকায় ফুটানি মারি না’। অন্যদিকে তৃতীয় চরিত্রটি হলো রয়ার গৃহকর্মী ময়না। যার সঙ্গে প্রেম আছে লিফটম্যান সবুজ মিয়ার।

কাজের মেয়ে ও গার্মেন্ট শ্রমিক চরিত্রে রিকিতা শিমুএই তিন চরিত্রের বেড়ে ওঠা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন পরিচালক। ক্যামেরা তাদের ওপরই ঘুরপাক খেয়েছে। একটি গল্পের মধ্যে তিন নারীর সংগ্রাম, যাতনা, বঞ্চনা সবই ছিল। তারা প্রত্যেকেই যার যার অবস্থান থেকে স্বাবলম্বি হতে চায়। রয়ার মা স্বাবলম্বি, রয়ার গৃহকর্মী ময়না তো প্রেমে উন্মাদ হয়ে শেষমেষ অনিচ্ছা স্বত্ত্বেও সবুজ মিয়ার হাত ধরে ঘর থেকে বের হয়ে যায়। ময়নার পেটে যখন সন্তানটি বেড়ে উঠছে ঠিক তখন রয়া তাকে আমন্ত্রণ জানায় ঘরে ফিরে আসার। তখন ময়না বলে ওঠে, ‘আর কতদিন অন্যের বাড়ির কাজ করবো?’ তখনই রয়া বুঝতে পারে ময়না বড় হয়ে যাচ্ছে। ময়নাও স্বাবলম্বি হতে চায়। আর সে তো এখন গার্মেন্টে কাজ করে। নিজের উপার্জনে চলে। তাহলে রয়া? তার কী হবে? সে কি- স্বামীর পয়সাতেই ফুটানি মারবে?

রয়া বনাম নন্দিনী:

শুরুতেই উল্লেখ আছে পরিচালক জোর দিয়েছেন রবি ঠাকুরের নন্দিনী চরিত্রের ওপর। নন্দিনী রবি ঠাকুরের রক্তকরবী’র এক অনবদ্য সৃষ্টি। যে চরিত্র মুক্তির বার্তা নিয়ে হাজির হয়। তার অনুপ্রেরণায় সবাই নিজের বন্দিদশা উপলব্ধি করতে পারে। নন্দিনীর স্পর্শে খোদ যক্ষপুরীর রাজাও শৃঙ্খল ভেঙে বের হয়ে আসতে চায়। আর সেই নন্দিনীতেই সারাক্ষণ ডুবে থাকে রয়া। কিন্তু মনের ক্ষুধা যে রয়ার মেটে না। সেই অতৃপ্তির শেষ কোথায় সেটাই রয়া সন্ধান করে বেড়ায়। ওই সন্ধানের সময় তার সামনে হাজির হয় নাট্য গবেষক ইমতিয়াজ। তার প্রেরণাতেই রক্তকরবীকে বর্তমান প্রেক্ষাপটে গার্মেন্ট শ্রমিকদের নিয়ে নতুন করে নন্দিনী চরিত্র তৈরি করতে চায় রয়া।

নন্দিনী চরিত্রে রয়ারয়া চরিত্রে অভিনয় করেছে বলিউড অভিনেত্রী শাহানা গোস্বামী। অসাধারণ অভিনয় প্রতিভা তার। রয়াকে ঠিক যেভাবে দেখাতে চেয়েছেন পরিচালক ঠিক যেন সেভাবেই ফুটে উঠেছে ছবিতে। নিশ্চিত করে বলে দেওয়া যায় শাহানা গোস্বামী রয়া চরিত্রের ভেতরেই মগ্ন ছিলেন। যেই মগ্নতা দর্শক সেকেন্ডে সেকেন্ডে অনুভব করতে পারবেন।

শহুরে নারী:

আন্ডার কনস্ট্রাকশনের শুরুই হয়েছে ঢাকা শহরের চিত্র দিয়ে। এর মধ্যে নারীদের নানান পেশার চিত্র দেখানো হয়। সবচেয়ে অসাধারণ লাগবে নারীরা গার্মেন্টে সেলাইয়ের কাজ করছে। ঠিক পরের দৃশ্যেই টপ ভিউ থেকে লং শটে দেখানো হয় ঢাকার রাস্তা। যেখানে খুব সুক্ষ্মভাবে দেখলে চোখে পড়বে- আড়ংয়ের বিশাল বিজ্ঞাপনের বিলবোর্ড। যে বিজ্ঞাপনে একজন নারী কাপড়ের মডেল হয়েছেন। পরিচালক হয়তো বোঝাতে চেয়েছেন, যে পণ্য নারীই তৈরি করছে, আবার সেই পণ্যের বিজ্ঞাপনেও নারী অংশ নিচ্ছে।

ইট-কংক্রিটের অবহেলার এই শহরে নারীদের মধ্যে রয়া নিজেকে ক্রমাগত খুঁজে ফিরেছে। সে অবিষ্কার করতে চেয়েছে নিজেকে। আবিষ্কার করতে গিয়েই সে অনুভব করে তার সামনে বেড়ে ওঠা ময়নাই হলো নন্দনী। আর তার গর্ভে রয়েছে রক্তকরবীর রঞ্জন। যার জন্যে একটি সুন্দর ভালোবাসার পৃথিবীর তৈরি করতে চায়। এই ইট-পাথরে ঘেরা শহরে হাজারও নারীর ভেতর রয়া হেঁটে চলে। তার এই চলমান জীবনের গল্পই বলে দেয়- প্রতিটি নারীর জীবন এখনও ‘আন্ডার কনস্ট্রাকশন’।

রয়ার এই চলমান জীবনের গল্পই বলে দেয়- প্রতিটি নারীর জীবন এখনও ‘আন্ডার কনস্ট্রাকশন’ছবির প্রশ্নবোধক চিহ্ন:

১. ছবিতে অনেক কিছুই প্রশ্নের জন্ম দিবে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো পুরুষ চরিত্রগুলোকে খুব বেশিই অবহেলিত করা হয়েছে। কোনও চরিত্রকেই সোজা হয়ে দাঁড়াতে দেওয়া হয়নি। বিস্তার লাভ করতে পারেনি। রয়ার স্বামী সামিরকে অধিকাংশ সময়ই দেখা গেছে ডায়নিং টেবিল, কম্পিউটার টেবিল কিংবা অফিসের কাজে বের হচ্ছে এমন দৃশ্যে।

অধিকাংশ ছবিতে নারীর যেমন অংশগ্রহণ থাকে ঠিক তেমনভাবে এই ছবিতে পুরুষের অংশগ্রহণ দেখানো হয়েছে। এই প্রথা থেকে বের হয়ে অন্তত একটি চরিত্রকে বিস্তার লাভ করতে দিলে ক্ষতি হতো না। পুরুষ-নারীর মনের দ্বন্দ্ব বিষয়টি উঠে আসতে পারতো যখন রয়া নিজের পরিচালনায় নাটকের কাজ শুরু করে দেওয়ার পরও স্বামী বাচ্চা নেওয়া তাগাদা দেয়।

২. বলিউডের আরেক অভিনেতা রাহুল বোস অভিনয় করেছেন নাট্যগবেষক ইমতিয়াজের চরিত্রে। তিনি তার চরিত্রে পরিপাটি ছিলেন। যতটুকু ছিল তার চেয়ে বেশি কিছু দেখালে বাড়তি মনে হতো। কিন্তু সমস্যা হয়েছে অন্য জায়গায়। রয়ার সঙ্গে ইমতিয়াজের একটি প্রণয় দেখানো হয়েছে। বিষয়টি ইমতিয়াজের আসার পর থেকে দর্শক অনুধাবন করতে পারবে কিন্তু অনিবার্য পরিণতিতে নারীর স্বামী থাকা স্বত্ত্বেও অন্য পুরুষের সঙ্গে যৌনতায় যাবে কেন? প্রগতিশীল নারী মানে তো স্বামীর সঙ্গে প্রতারণা নয়। এছাড়াও একটি দৃশ্যে দেখানো হয়- রয়ার জন্য তার স্বামী চা বানিয়ে আনে, সেই চা সে হাইকমোডে ফেলে দেয়। এরও মাজেজা বোঝা বড় মুশকিল। ঠিক কোন দিকে ইঙ্গিত দিতে চেয়েছেন পরিচালক?

পরিচালক রুবাইয়াত হোসেন৩. পুরো ছবি জুড়ে পরিচালক সময়কে ধারণ করতে চেয়েছেন। রানা প্লাজার ট্র্যাজিডিও চলে এসেছে সময়ের তাড়নায়। কিন্তু সিএনজি দিয়ে যাওয়ার পথে একটি মিছিল দেখানো হয়। মিছিলের স্লোগান ছিল, ‘নাস্তিকদের ফাঁসি চাই’। কি দরকার ছিল এই মিছিলের? সময়ের মধ্যে তো যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিও ছিল। তাহলে সে দাবি কোথায়?

শেষ হইয়াও হয় না শেষ:

‘আন্ডার কনস্ট্রাকশন’ ছবির সবচেয়ে দুর্দান্ত দিক ছিল সমাপ্তি। ঠিক যে জায়গায় ছবিটি শেষ হয় সেখানে তখনও অনেক গল্প বাকি। অস্কার বিজয়ী ইরানি চলচ্চিত্র নির্মাতা আজগর ফরহাদির ছবিগুলোও এমন। তিনি একবার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘ছবিটি আমি এমন জায়গায় শেষ করতে চাই যেখান থেকে আরেকটি গল্প তৈরি হতে পারে। আর সেটা মানুষের জীবনের মতোই। জীবনের কোনও গল্পের সমাপ্তি হয় না।’ রুবাইয়াত হোসেনের এই আইডিয়া আজগর ফরহাদিকে মনে করিয়ে দেয়। মনে হয় বাংলা সিনেমায় এক্সপেরিমেন্টের নতুন মাত্রা যোগ হওয়া শুরু হয়েছে।
“>ছবিটির একটি নান্দনিক পোস্টারছবিটির বিষয়ে লেখা শেষ করার আগে আরও কিছু প্রশংসা করেই শেষ করতে হয়। ছবির সম্পাদনা ছিল চমৎকার আর চিত্রগ্রহণে মার্টিনা রডওয়ান এবং শব্দ পরিকল্পনায় সুজন মাহমুদ তাদের দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। ব্যাকগ্রাউন্ডে ক্রমাগত আন্ডার কনস্ট্রাকশনের আওয়াজ শহুরে বাস্তবতাকে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে সকলেই। পোশাক নির্বাচনেরও প্রশংসা করতে হয় শাহরুখ আমিনের। বিশেষ করে শাহানা গোস্বামীর সাধারণ সাজগোজ যে মাত্রা দিয়েছে তাতে করে মনেই হয়নি কোনও ছবির কোনও চরিত্র দেখছি। মনে হচ্ছে চোখের সামনে রয়া নামে এক অনবদ্য চরিত্র দেখছি। অন্যদিকে অভিনয়ের প্রশংসায় রিকিতা শিমুকেও এগিয়ে রাখতে হবে। শিমুকে এর আগে আমরা তারেক মাসুদ নির্মিত ‘রানওয়ে’ ছবিতে দেখতে পেয়েছিলাম। সেখানে তার চরিত্র খুব একটা বিস্তার লাভ করেনি বলে অভিনয় দক্ষতা সম্পর্কে জানা যায়নি। কিন্তু আন্ডার কনস্ট্রাকশন ছবিতে শিমু প্রমাণ করে দিলেন নিজ দক্ষতা। অন্যদিকে রয়ার কর্পোরেট স্বামী শাহাদাত হোসেন, মা চরিত্রে মিতা রহমান এবং বান্ধবী চরিত্রে নওশাবাও ছিলেন বেশ সাবলীল। মোটাদাগে রুবাইয়াত হোসেনের তৈরি সবগুলো চরিত্রই ছিল অভিনয়ে বেশ স্বচ্ছন্দ। শুধু অভিনয় বিচারে খানিক বিরক্তির কারণ হতে পারেন মঞ্চ নাটকের দলনেতা তৌফিকুল ইসলামের অভিনয় দেখে।

“>রাহুল বোস ও শাহানা গোস্বামীপরিশেষে বলা যায়, ছবিটি দেখার সময় মেকি কোনও উপলব্ধি আসবে না দর্শকের অন্তরে। মনে হবে নিজের চেনা-জানা ঘটনাগুলোর আরও ভেতরের গল্পই যেন দেখছে দর্শক। সমাজ বাস্তবতার এক অনবদ্য প্রতিচ্ছবি তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন রুবাইয়াত হোসেন। তার প্রথম ছবি থেকে প্রাপ্ত সমালোচনার কিছুটা হলেও পেছনে ফেলবে ‘আন্ডার কনস্ট্রাকশন’। তাছাড়া প্রথার বাইরে এসে তিনি ক্যামেরা তাক করলেন নারীর জীবন আর মনোজগতের ওপর। এও তো বাংলা সিনেমায় রুবাইয়াত হোসেনের এক অন্যরকম ইউটার্ন।

খনা টকিজের প্রযোজনা ও পরিবেশনায় ছবিটি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছিল ২০১৬ সালের ২২ জানুয়ারি।