এত বিতর্ক কেন ‘জিরো ডিগ্রী’ নিয়ে?

Zero-Degree-4সম্প্রতি বেশ অালোচনায় অাছে নির্মাতা অনিমেষ আইচের প্রথম ছবি ‘জিরো ডিগ্রী’। এই ছবি প্রধানত তিনটি চরিত্রকে নিয়ে এগিয়ে গেছে। অমিত চরিত্রে মাহফুজ, নীরা চরিত্রে রুহি এবং সোনিয়া চরিত্রে জয়া। এটি দেখার সময় ভাবছিলাম, ছবিটিকে কোন মানদণ্ডে ফেলব- অ্যাকশন, অার্ট, রোমান্টিক, থ্রিলার নাকি ফ্যান্টাসি।

ছবির কাহিনী নিয়ে বিস্তর অালোচনার অবকাশ নেই। তবুও কিছুটা বলে নেওয়া যায়- এর গল্পের শুরু হয় মাহফুজ এবং রুহির সংসারের গল্প দিয়ে। শহুরে উচ্চমধ্যবিত্ত দম্পতি তারা। রাতে মদ-সিগারেটের অাড্ডা জমে তাদের বাসায়। দুজনের প্রেম, সুখ অার অানন্দ দিয়েই ছবির কাহিনী এগোয়। কাজে ব্যস্ত এই দম্পতির তবুও সন্তানের জন্য ভালোবাসা- স্নেহের কমতি নেই। অর্ক নামে একটি ছেলেকে দুজনই সমানভাবে সময় দেন, ভালোবাসা দেন। মাহফুজ অর্থাৎ অমিতকে পরিচালক সাদামাটা একজন মানুষ হিসেবেই তুলে ধরতে চেয়েছেন। যেখানে এক জায়গায় মাহফুজ বলে, ‘অামি সাদামাটা, অামি হলাম ওপেন বুক, কোনো রহস্য নেই।’ অন্যদিকে রুহি অর্থাৎ নীরা ক্যারিয়ার নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে দুরন্ত গতিতে। ঘন ঘন দেশের বাইরে অফিসের কাজে যায় নীরা। এমনটাই পরিচালক বোঝাতে চেয়েছেন।

এভাবেই একদিন রুহি বিদেশ চলে যায়। অার হয়ে যায় চোখের অাড়াল। এ জায়গাতেই গল্পের ক্লাইমেক্স তৈরি হয়। তারপর নানান সংঘাতে মানসিক বিকারগ্রস্থ হয়ে মানসিক হাসপাতালে চলে যায় অমিত। মূলত সিনেমা শুরু হয় এই জায়গা থেকেই। যখন শুরু হলো ঠিক তখনই কাহিনীতে প্রবেশ করে সোনিয়া অর্থাৎ জয়া। গল্প শুরু হয় সোনিয়ার।

২.

চলমান সমাজেই নারীর চারপাশে নানান সংকটের জাল। নারী যখন একা, তখন যেন সমাজও একটা সংকট হয়ে দাঁড়ায়। পুরুষের কামুক চরিত্রের থাবায় অাক্রান্ত হতে থাকে সোনিয়া। অার গল্পের বাঁকে সে বারবার সমাজের সংকটের সঙ্গে লড়াই করতে থাকে। সোনিয়া বিশ্বাস করতে চায় সমাজকে। বারবার তার বিশ্বাসের কাঁচ ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত প্রেমে পড়ে এক কবি, নাম ওয়াহেদ। সেই কবিকে বিশ্বাস করেও লাভ হয়নি। পুরুষের যৌন অাকাঙ্খার ফাঁদে অাবারও তাকে পড়তে হয়। এরপর মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে সোনিয়াও চলে অাসে মানসিক হাসপাতালে।

Zero_Degree-01দর্শকভাবে হয়তো এখানেই দেখা হবে দুজনের। একজন নারীর প্রতারণার শিকার। অন্যজন পুরুষের কামুকের শিকার। দুই অসহায় মানুষ হয়তো একসঙ্গে কিছু একটা কিছু করে বসবেন। কিন্তু তা অার হলো না। পরিচালকের মুন্সিয়ানার কাছে হেরে যায় দর্শক। সোনিয়া সুস্থ হয়ে নেমে পড়ে প্রতিশোধে, অন্যদিকে অমিত খুঁজে বেড়ায় নীরাকে। এভাবে প্রতিশোধ নেওয়ার খায়েশে দুজনই লড়াই চালিয়ে যেতে থাকে।

তাদের লড়াইয়ের পুরো সময় জুড়ে মনে হয়েছে এটি অ্যাকশন কিংবা রোমান্টিক ছবি। কিন্তু ক্রমেই পৌঁছায় অার্ট ফিল্মের দিকে। মনে হয় এমন সিনেমা নির্মাণ করে অনিমেষ অাইচ নতুন দিগন্তের দিকে দর্শকদের নিয়ে যাচ্ছেন। ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক, সিনোমেটোগ্রাফি, কস্টিউম ডিজাইনে মুন্সিয়ানা ছিল। মুগ্ধ হয়েছে দর্শক। মেকাপে জয়া এবং রুহিকে লেগেছে অসাধারণ। চরিত্রের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া গেছে দুজনকেই। রীতিমতো ‘সাধারণ’ দর্শকদের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে দুই নায়িকা চরিত্রই।

ছবির অনেক শট অাছে যা ভিন্ন অবয়ব তৈরি করতে পেরেছে। বি‌‌শেষ করে যখন নীরার চিন্তায় মগ্ন অমিত। তখন ক্যামেরা অমিতের বারান্দা থেকে প্যান করে শহরের রাতের অন্ধকারে অালো জ্বলতে থাকা ফ্ল্যাটগুলোর জানালা দেখানো হয়। যেন মনে হচ্ছিল, এমন অনেক গল্প প্রতিটি ঘরেই রয়েছে। জানে না কেউ, খোঁজ নেয় না কেউ।

গল্প উত্তেজনায় ভরপুর। কখনও সোনিয়া, কখনও অমিত, কখনও নীরার গল্পে বারবার পরিচালক উঁকি দিয়েছেন। একবারের জন্যও ছন্দপতন হয়নি। মনে হয়েছে একটানে দেখছে দর্শক। কাউকে বিরক্ত হতে দেখা যায়নি। কিছু যৌন সুড়সুড়ির দৃশ্য অাছে। চরিত্রের প্রয়োজনে, কাহিনীকে অারও দুর্দান্তভাবে ফুটিয়ে তুলতে ওই যৌনসুড়সুড়ি শটগুলোকে অপ্রাঙ্গিক মনে হয়নি একদম।

Zero_Degree-03

তবে ছবির শেষ দিকে অনেক দৃশ্যকে অপ্রাসঙ্গিক কিংবা ব্যাখ্যাহীন মনে হয়েছে। যেমন, নীরার খোঁজে অমিত যায় সিঙ্গাপুর। সেখানে থেকে হুট করে কখন বাংলাদেশে চলে এল এবং মোটরবাইকে সোনিয়াকে কেন তুলে নিল- তা রহস্যই থেকে গেল।

অাবার সোনিয়া যখন প্রতিশোধ নিতে গিয়ে কবি ওয়াহিদকে খুন করে সেই ঘটনাটা ঘটে শত মানুষের সামনে। কেউ তাকে থামায়নি। কেউ তাকে অাটকায়নি। এমনকি অনেকে মোবাইলে ভিডিও করার দৃশ্যও দেখানো হয় ছবিতে। কিন্তু অাবার পুলিশ ওই খুনির ছবি স্পষ্ট করে পাচ্ছিল না। অথচ মোবাইল ভিডিও বর্তমান যুগে খুব দ্রুত সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ছড়িয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু ওই খুনের দৃশ্য হাতে অাসেনি পুলিশের! বিষয়টি খুব ছেলেখেলা মনে হয়েছে। খুন করার পর যখন সোনিয়া মানুষের জটলা থেকে বের হয়, তখন পুলিশও অাসতে থাকে। অার হুট করেই এসে সোনিয়াকে তুলে নিয়ে যায় অমিত। এই পুরো দৃশ্যটাই বেমানান মনে হয়েছে।

দেখে মনে হয়েছে, পরিচালক হয়তো চেয়েছেন তিনটি চরিত্রের মিলন ঘটাতে। কিন্তু এই মিলনের জায়গায় তিনি মুন্সিয়ানায় তেমন পারদর্শী দেখাতে পারেননি। তবুও এই ঘটনাটুকু বাদ দিলে ছবির প্রতিটিক্ষণ থ্রিলারে ভরপুর।

৩.

শুরুতেই বলেছি এক নতুন দিগন্তের দিকে ইশারা দিয়েছেন পরিচালক। একই সিনেমায় তিনি থ্রিলার, রোমান্স, অ্যাকশন, অার্ট ফিল্মের সংমিশ্রণ ঘটিয়েছেন। এক অন্যরকম মন্তাজ ঘটিয়েছেন। এটিকে অামরা ফারাসি সমালোচকদের ভাষায় অসাধারণ ‘মিজ-অঁ-সেন’ বলতে পারি।

মিজ-অঁ-সেন ঘটানোর জন্য যে লাইটিং, পোশাক-পরিচ্ছদ, প্রধান চরিত্রগুলোর অাচার-অাচরণগুলোর ধারা প্রয়োজন তার সবগুলো শর্ত পূরণ করেছে। অাগেই মানসিক বিকার হয়েছে সোনিয়া এবং অমিতের। কিন্তু নীরারটা হয়েছে খুব ধীরে ধীরে। শেষে তিনটি চরিত্র যখন একসঙ্গে হয়েছে, তখন নীরার বিকারগ্রস্থের পরিণতি ঘটে। তারা সিদ্ধান্ত নেয় নিজেদের হত্যা করার। গল্পে তখন পুলিশ, গোয়েন্দাদের প্রবেশ। এই তিনটি চরিত্রকে একসঙ্গে করে খোঁজার বিষয়টি উঠে অাসে। পুলিশের অাসার অাগেই পরিণতি ঘটে তিনটি বিকারগ্রস্থের চরিত্রের। শেষ হয় ‘জিরো ডিগ্রী’। পরে টপ ভিউ থেকে ক্যামেরায় যখন তিনটি লাশকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখায়, এই শট দর্শক অনেকদিন মনে রাখবে। এবং রাখার মতো।

এই ছবিতে গান অাছে। গানগুলোর চিত্রায়নেও মুগ্ধ দর্শক। অার এই সিনেমা থেকে অনেকগুলো বার্তাও পাওয়া যায়। সংসারে একজনের ভুল কীভাবে সবার জীবনকে দূর্বিসহ করে তোলে- তা ওঠে এসেছে। এই শহরের হাজারো গল্পের ভেতর যে যৌনতা ঘুরে বেড়ায়, তা কতো নারীর জীবনকে ধ্বংস করে দিচ্ছে- সেটাও উঠে এসেছে। অার দুটি গল্পকে, দুইভাবে ব্যাখ্যা করে একমুখী করে পরিচালক হিসেবে সফল হয়েছেন অনিমেষ অাইচ। বলা যায়, বাংলা সিনেমার নতুন দিগন্তের সূচনায় যোগ হয়েছে ‘জিরো ডিগ্রী’।