ফারুকীর কৃষ্ণকলি

Modelসুন্দর। তুমি বড় সুন্দর। যদিও এ জগতের মানুষ সুন্দরের ব্যাখ্যা অাজও ঠিক করে নিতে পারেনি। কারও চোখে কালো সুন্দর, কারও চোখে ফর্সা সুন্দর। কারও কাছে লম্বা কেশ কিংবা দেহের গঠন। কারও কাছে সুন্দর করে কথা বলতে পারাও সুন্দর। তবে কী সুন্দরের কোনো সংজ্ঞা নেই?

অাছে তো! বিশেষ করে নারীর সৌন্দর্য নিয়ে তো অালোচনার শেষ নেই। নারীর অবয়ব কে বা কারা নির্ধারণ করে দেয়? এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলেই সামনে দাঁড়িয়ে যাবে মিডিয়া। তারাই সমাজকে বলে দেয় সুন্দরের সংজ্ঞা। মিডিয়া বা গণমাধ্যম বলতে কতকিছুই তো অাছে। নাটক অাছে, সিনেমা অাছে, বিজ্ঞাপন অাছে। এসবের দিকেই তো সবার নজর। ঘরে ঘরে মেয়েরা তো সাজগোজে মিডিয়ার নারী ক্যারেক্টার ফলো করে থাকে। কিংবা তাদের স্টাইলকে মডিফাই করে নিজের একটা স্টাইল তৈরি করে নেয়। সেটাকে সুন্দর হিসেবে কী ধরে নেয়া যায়?

নাহ! সুন্দর নারী মানে তার সব কিছু। দেখতে ফর্সা, লম্বা, দৈহিক গঠন অাবেদনময়ী, লম্বা কেশ, টানা টানা চোখ। সব মিলিয়েই তো সুন্দর। তবে সুন্দর কাহাকে বলবো? এই প্রশ্নের উত্তরে অামার মুখ থেকেই প্রথম বের হবে, “ফর্সা”।

কালো তো কারও পছন্দ না। কালো তো শোকের রং। সে শোক মানুষের দেহে লেপটে থাকবে কেন? সেই শোক নিয়ে কে-ই বা শুনতে চায় তোমার বোন কালো, তোমার মা কালো, তোমার বউ কালো! অামাদের শোকের রং পছন্দ না। সমাজের পছন্দ ফর্সা। সাদা। যে দেখলেই চকচক করবে। যা দেখলেই মনে রঙ জেগে উঠবে।

এই সমাজ এগুলো কেন ভাবে? ভাবে কারণ অামাদের সুন্দরের সব প্যারামিটার তো ঠিক করে দিয়েছে মিডিয়া। নায়িকা কখনও কালো হবে না। মডেল কখনও কালো হবে না।

চেহারাতেই লেখা হবে ভাগ্য

একটা ক্রিমের বিজ্ঞাপন দেখে তো মুচকি হাসি ছাড়া অার কিছু করারও ছিল না। বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল “চেহারাতেই লেখা হবে ভাগ্য”। গল্পটা একটু বলে দেই, অভাবের সংসারে বাবা এককাপ চা চায়। ঘরে দুধ নেই। সে কথা বলেই মা বলে ওঠেন “মেয়ের কামাই এভাবে অার কত খাবে?” এমন প্রশ্নের উত্তরে কালো মেয়ের বাবা বলে ওঠেন “যদি একটা ছেলে থাকতো!” এই অাফসোসের হুইসেল তো বিজ্ঞাপনে এভাবে অাসেনি। এসেছে সমাজ থেকেই। কিংবা এই দীর্ঘশ্বাস সমাজে ঢুকেছে উপন্যাস, গল্প, কবিতা, সিনেমা কিংবা বিজ্ঞাপন থেকেই।

যাইহোক, ফিরে অাসি বিজ্ঞাপনে। বাবার এই কথা শুনে ফেলে মেয়ে। তারপর বিছানায় শুয়ে শুয়ে কাঁদতে থাকে। কালো মেয়ে তো অার ভালো চাকরি পাবে না। এরপর ব্যবহার করা শুরু করে একটি ক্রিম। সেই ক্রিম ব্যবহার করে এয়ারহোস্টোজের চাকরির জন্য অবেদন করে। তার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে তাকে চাকরি দেয়া হয়। ঘুরে গেল নারীর ভাগ্য। কালো রং সাদা করে নতুন করে লিখে নিলেন ভাগ্য।

এমন বিজ্ঞাপন দেখে দেখেই গড়ে উঠেছে সমাজ। নারীর মেধার কথা না বলে মিডিয়া বলে যাচ্ছে, হে নারী তুমি কী ফর্সা? তুমি লম্বা? তোমার দেহে কী অাবেদন অাছে? শহরের বিলবোর্ড, পত্রিকার পাতায় পাতায় বিজ্ঞাপন সব জায়গায় একই প্রশ্ন করে যাচ্ছে নারীদের। অার কালো নারী? অনেকেই তো সুন্দরের সব চেষ্টায় মত্ত। সৃষ্টির রঙকেও যেন সে ঘৃণা করতে শুরু করে।

মিডিয়াই বলে যাচ্ছে তুমি সুন্দর হও। না হলে কেউ তোমাকে ভালোবাসবে না। তোমার বিয়ে হবে না। তোমার চাকরি হবে না। জীবনের রেলগাড়িটা পিছিয়ে যাবে।

২০০৮ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে ৬৯% নারীরা ম্যাগাজিন বা পত্রিকার মডেলদের দেখে সুন্দর হওয়ার চেষ্টা করেছেন। তাদের কাছে অাদর্শ নারী বলতেই দেখতে সুন্দর। যুক্তরাষ্ট্রে নারীদের গড় উচ্চতা ৫’৪ ইঞ্চি। যেখানে তাদের মিডিয়ায় নারী মডেলদের গড় উচ্চতা ৫’ ১১ ইঞ্চি। অারও অবাক করার বিষয়টি হলো ৪৭% নারী খাদ্যাভাসে পরিবর্তন এনেছেন স্বাস্থ্য কমানোর জন্য। অার এজন্য তারা পত্রিকায় মডেলদের দেখে উৎসাহিত হয়েছেন।

২০০৮ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে ৬৯% নারীরা ম্যাগাজিন বা পত্রিকার মডেলদের দেখে সুন্দর হওয়ার চেষ্টা করেছেন। তাদের কাছে অাদর্শ নারী বলতেই দেখতে সুন্দর। যুক্তরাষ্ট্রে নারীদের গড় উচ্চতা ৫৪ ইঞ্চি। যেখানে তাদের মিডিয়ায় নারী মডেলদের গড় উচ্চতা ৫১১ ইঞ্চি। অারও অবাক করার বিষয়টি হলো ৪৭% নারী খাদ্যাভাসে পরিবর্তন এনেছেন স্বাস্থ্য কমানোর জন্য। অার এজন্য তারা পত্রিকায় মডেলদের দেখে উৎসাহিত হয়েছেন। (Eating disorders: body image and advertising . (2008, December 11)

মিডিয়া যখন এতই কাবু। কিংবা বলা যায় সৌন্দর্য ব্যাখ্যায় মিডিয়া যখন ফর্সাকেই বেছে নিচ্ছেন ঠিক তখন ফারুকী বেছে নিলেন কালোকে।

ফারুকীর কৃষ্ণকলি:

সম্প্রতি ফারুকীর তৈরি একটি বিজ্ঞাপন টিভিতে প্রচার হচ্ছে। যা দেখে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে হয়। ভাবতে হয় সাদার প্রতিযোগিতায় ফারুকী কেন কালোকে বেছে নিলেন? কালো জগতের অালো। ফারুকী মনে হয় সেই পুরানো উক্তিটি সামনে নিয়ে অাসলেন।

তার বিজ্ঞাপনের শুরুতেই একটি শিশুকে দেখিয়ে কোনো এক নারী বলছেন, “মেয়ের যা রঙ বিয়ে দিতে খবর অাছে ”।

ঠিক তো। কালোর রঙের মেয়ে বিয়ে করতে এসমাজের পুরুষের যত অাপত্তি! কালো মেয়েদের বিয়ে হতে খবরই হয়। যে বাবার মেয়ে কালো তার যেন জগতই কালো। এমন কথাও তো অামরা শুনি। অামরা এও তো শুনি নারীরাই নারীকে পেছনে পাঠিয়ে দেয়। তাই তো এক নারীর কণ্ঠেই ফারুকী শোনালেন, “মেয়ের যা রঙ বিয়ে দিতে খবর অাছে ”।

এরপর শিশুটি একটু বড় হলো। সে নাটকে রাজকন্যা হতে চায়। তার চাওয়াটাই কী সব? কালো মেয়ের রাজকন্যার রোল পাওয়া কী সম্ভব? সম্ভব না। সেই মেয়েই যখন বড় হলো। বিয়ে হলো। তার গর্ভে সন্তান। তখন দুধ-কলা বেশি খাওয়ানোর উদ্দেশ্য সেই নারীর সন্তান যেন কালো না হয়। এ সমাজে গর্ভবতী নারীর স্বাস্থে্যর চেয়ে বড় হলো ফর্সা সন্তান। তাই তো ফারুকী বলেছেন “এখানে জন্মের অাগেই চলে তোমাকে ফর্সা বানানোর চেষ্টা”।

তারপর শেষে দেখা যায় এক মডেলকে। পরিচালক যাকে ফর্সা করতে বলেন। তখন মডেল বলে ওঠেন, “অামাদের সমস্যাটা কোথায়? জন্মের পর থেকে শুধু ফর্সা ফর্সা করার চেষ্টা। সুন্দর মানে কী শুধুই ফর্সা? সুন্দর কালো হয়। সুন্দর ফর্সা হয়। শ্যামলা হয়।”

Teesha

চমৎকারভাবেই ফারুকী বলে দিলেন সমাজের সব সত্য। সমাজকে ভাবতে বলে দিলেন, শুনো কৃষ্ণকলি সৌন্দর্য তোমার গায়ের রঙে নয়।

মিডিয়া যখন সুন্দরের প্রতিযোগিতায় মরিয়া তখন কালোকে ফারুকী তুলে নিলেন অার বললেন ফ্রেশ চিন্তা করতে। চিন্তা বদলাতে বিজ্ঞপনের অাবেদনকে বেছে নিলেন ফারুকী। অথচ কালোর কথা বলতে গিয়েই তিনি তো বলেছেন, তোমাকে কথা শুনতে হবে। তোমাকে কেউ রাজকন্যার পার্ট দেবে না।

ফারুকী যে মডেলকে সামনে অানলেন তিনি তাকে তো কালো করে নয়, মেকাপ দিয়ে ক্যামেরায় দিয়ে দেখালেন। ঝকঝকে টিভিস্ক্রিনে দেখা গেল মডেল তার কালো রঙ ঢেকে ফেলেছেন সাদা মেকাপে। তাহলে কী বলতে হবে ফারুকীও ৯৯% সফল হয়েও শেষ জায়গায় এসে এটিকে ফর্সার বিজ্ঞাপনই বানিয়ে দিয়েছেন?

অামরা তো কালোকে কালো করে দেখতে চাই না। অামরা কালোকেও ফর্সা করেই দেখতে চাই। অার এজন্যই মনে হয় বিজ্ঞাপনের মডেলকে মেকাপ করেই সামনে তুলে অানলেন মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। কেউ তো অার উল্টোটা করবে না। সাদা মডেলকে কালো বানিয়ে বলবে না, কালো হলেও বিয়ের সমস্যা হবে না। কালো হলেও তুমি রাজকন্যা হতে পারবে। এগুলো তো কেউ বলবে না।

যদিও রবী ঠাকুর বলেছেন, “কালো? তা সে যতই কালো হোক, দেখেছি তার কালো হরিণ-চোখ”।

সমালোচনা বাদ দিলে বিজ্ঞাপনে ফারুকীর ভাবনা ভিন্ন। তার চেষ্টায় সমাজকে ধাক্কা দেওয়ার চেষ্টা ছিল। তাই তো টিভি সেটের সামনে বসে বিজ্ঞাপন দেখে অনেককেই বলতে দেখেছি “কী অসাধারণ”। সত্যিই ফারকীর এমনসব চেষ্টা অসাধারণ। ফারুকীর বেশকিছু বিজ্ঞাপন অাইডিয়াতে সমাজ কিংবা পারিবারিক বিষয়গুলো তুলে অানার চেষ্টা ছিল। মিথ্যা অাশ্বাসের পিছে ফারুকীকে তেমন ছুটতে দেখা যায়নি। যা হয় এই শহরে, এই সমাজে সেটা তুলে অানেন ফারুকী। এও তো খারাপ না।

এই বিজ্ঞাপনের মূল কনসেপ্ট দিয়েছেন মালিক মোহাম্মদ সাঈদ, এসটিএল, হেড অব মার্কেটিং। অ্যাজেন্সি হিসেবে ছিল সান কমিউনিকেশন।

ডিজিটাল অ্যাজেন্সি হিসেবে কাজ করেছে- ওয়েবপার্স