অগ্নি: নারীর এক ভিন্ন অবয়ব

Agneeবাংলাদেশে সবাক চলচ্চিত্রের বিকাশ শুরু হয় ১৯৫০ দশকে। বাংলাদেশের ‘চলচ্চিত্রকে’ পূর্ণমাত্রা পেতে সময় লেগেছে। উইকিপিডিয়ার তথ্য থেকে জানা যায় বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিবেশের সঙ্গে খাপ খেতে চলচ্চিত্রের সময় লেগেছে প্রায় ৫০ বছর। ১৯৯০ এর দশকে বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে ৮০টির মত পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র মুক্তি পেত। হিসেবে দেখা যায় ২০০০ সালের পর তা সংখ্যায় ১০০-তে গিয়ে ঠেকেছে।

হিসেব যদি এমন হয়, তবে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র পাড়ার পরিসরকে বেশ বড় বলেই বিবেচনা করা যায়। তবে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে গল্পের খুব একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়নি। যদিও মুলধারার ব্যবসায়ীক নির্ভর সিনেমায় অনেক সময় পরিবর্তনের ছাপ লক্ষ্য করা গেছে। স্বাধীনতার পূর্বে জহির রায়হানের জীবন থেকে নেয়া চলচ্চিত্র শাসকগোষ্ঠীকে ব্যঙ্গ করে নতুন একটি স্টাইলের জন্ম দিতে সমর্থ হয়েছিল। এছাড়াও স্বাধীনতার পূর্বে কবীর চৌধুরী,সাজেদুল আওয়াল, তানভির মোকাম্মেল, মোরশেদুল ইসলাম, তারেক মাসুদ, মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ভিন্নভাবে গল্প বলার চেষ্টা করেছেন এবং করছেনও।

 চলচ্চিত্রে নারী:

এবার খুব দ্রুত চলচ্চিত্রে নারীর অবস্থান নিয়ে একটু আলোচনা করা যাক। মূলধারার রোমান্টিক অ্যাকশান, হরর প্রভৃতি চলচ্চিত্রে নারীর অবস্থানকে লক্ষ্য করা যেতে পারে। চলচ্চিত্রে নারী ভূমিকার খুব একটা পরিবর্তন সারা বিশ্বে তথা বাংলাদেশেও লক্ষ্য করা যায়নি। নারীর সংগ্রামী মুখ, পরিশ্রমী মুখচ্ছবি উঠে আসেনি চলচ্চিত্রে।

বাংলাদেশের অধিকাংশ সিনেমাতেই দেখা যায় অসহায় নারীর প্রতিচ্ছবি। কিংবা তার সংগ্রামের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় নারীর আসল চেহারা। কিংবা কখনও কখনও নারীকে সংগ্রামী দেখাতে গিয়ে বাঙালি নারীর কোমলতা বঞ্চিত হতে হয়েছে নারীকে। অথচ নারীর দুটো রূপই বিবেচনায় আনা যেত। এসব নিয়ে আলোচনা সমালোচনা করতে গিয়েই উদ্ভব হয়েছে নারীবাদী চলচ্চিত্র তত্ত্বের।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং চলচ্চিত্র বিষয়ক গবেষক ড. ফাহমিদুল হকের “নারীবাদী চলচ্চিত্র তত্ত্ব: একটি পর্যালোচনা” শিরোনামে গবেষণা প্রবন্ধে থেকে জানা যায়, হলিউডের ১৯২০ ও ১৯৩০-এর দশকের চলচ্চিত্রে নারীর অবস্থান ছিল পতিতা অথবা কুমারী; মূলত এই দুই ভূমিকায় সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছিল নারীদের।

সুসান হেওয়ার্ড নারীবাদী চলচ্চিত্র তত্ত্বের বিকাশকে তিনটি ভাগে ভাগ করেছেন। ফাহমিদুল হক তার রচনায় এবিষয়গুলো নিয়েই আলোচনা করেছেন।

তত্ত্বেবের প্রথম পর্যায় (১৯৬৮-১৯৭৪)শ্রেণী থেকে জেন্ডার। এ পর্যায়ে দেখা যায় যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৭০-এর দশকের প্রথম দিকে যুক্তরাষ্ট্রের চলচ্চিত্রে নারীর উপস্থাপনা বিষয়ক প্রধান গবেষক ছিলেন মোলি হাস্কেল, মারজরি রোজেন ও জোয়ান মেলেন।

তাদের কাজের ধরন ছিল সমাজতাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক, যা সেসময়ের আমেরিকান চলচ্চিত্র-সমালোচনারই ধরন ছিল। তাদের বিশ্লেষণে, হলিউডের চলচ্চিত্রে নারী যে পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার নিষ্পেষণের শিকার, এই বিষয়টি উঠে এসেছে। মোটের ওপরে তারা বলতে চেয়েছেন হলিউডের চলচ্চিত্রে নারীকে হয় কুমারী নয় পতিতা, এই দুই রূপে উপস্থাপন করা হয়ে থাকে।

দ্বিতীয় পর্যায় (১৯৭৫-১৯৮৩) পুরুষের মনঃসমীক্ষণ। এখানে ফাহমিদুল হক আলোচনা করেছেন, মোলি হাস্কেল ও অন্যান্য সমালোচকরা ওয়েস্টার্ন জঁরার চলচ্চিত্রের বিশ্লেষণ বিষয়ে। যেখানে পুরুষসৃষ্ট গণ্ডগোলের মধ্যে নারীর ভূমিকা পুরুষের ক্রিয়া ও পছন্দের ওপরে নির্ভরশীল।

এক্ষেত্রে ওয়েস্টার্ন চলচ্চিত্রের উদাহরণ দিয়ে বলা হয়েছে, সেসব চলচ্চিত্রে পুরুষটি সূর্যাস্তের পর অস্ত্রহাতে ঘোড়ায় চড়ে চলে যায়, পেছনের নারীটির ভাগ্যে কী ঘটতে পারে সেসব চিন্তা না করেই।

সবশেষ আশির দশক থেকে বর্তমান দশকের কথা বলতে গিয়ে ফাহমিদুল হক উল্লেখ করেন, আশির দশকে ব্রিটেনে সাংস্কৃতিক অধ্যয়নে (cultural studies) ঐতিহাসিক ও বস্তুবাদী ধারায় তখন অনেক কাজ হচ্ছিল, নারীবাদী চলচ্চিত্র তাত্ত্বিকেরা সেই ধারাতেই চলচ্চিত্র নিয়ে কাজ করতে থাকেন। ঐ ধারায় জনসংস্কৃতির (popular culture) বিভিন্ন উপাদানে শ্রেণী, জেন্ডার ও বর্ণ এবং এসবের সঙ্গে মতের কী সম্পর্ক এবং পাশাপাশি মতের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ইত্যাদি পরীক্ষা-গবেষণা করা হচ্ছিল। আর যুক্তরাষ্ট্রের নারীবাদীরা ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো এবং তার মতাদর্শতত্ত্বের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন।

এভাবেই চলচ্চিত্রে নারীর অবস্থান আলোচনায় আসে। গবেষণা শুরু হয় নারীকে কিভাবে উপস্থাপন করা হবে চলচ্চিত্রে।

অগ্নি বিশ্লেষণ:

‘কেউ নারী হয়ে জন্ম নেয় না, বরং হয়ে ওঠে নারী’, নারী সম্পর্কে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ও স্মরণীয় এ-মন্তব্যটি সিমোন দ্য বোভোয়ারের, যিনি শুধু বিশশতকের নয়, চিরকালের শ্রেষ্ঠ নারীদের একজন।।

সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া “অগ্নি” চলচ্চিত্রের প্রধান চরিত্র তানিশাকে নারীর অন্যরূপ হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছেন পরিচালক ইফতেখার চৌধুরী।

2

যাইহোক শুরুতেই কাহিনী সংক্ষেপ জেনে নেয়া যাক, ছবির মূল চরিত্র তানিশা। এ চরিত্রে অভিনয় করেছেন মাহিয়া মাহী। সিনেমাজুড়ে তাকে দেখানো হয়েছে একজন হত্যাকারী হিসেবে। সে খুঁজে বেড়ায় তার বাবা-মার হত্যাকারীদের।

সবার খোঁজে তানিশা পাড়ি জমায় থাইল্যান্ডে।এসব কিছুর মধ্যে অবশ্য ফ্ল্যাশব্যাক থাকবে। যেখান থেকে আমরা জানবো অগ্নি কেন ‘অগ্নি’ হয়ে উঠলো।

সিনেমায় নায়কের ছদ্ম নাম ড্রাগন। তবে আসল নাম শিশির। ছবিজুড়ে তার অবস্থান একজন নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে।শিশির চরিত্রে অভিনয় করেছেন আরেফিন শুভ। তানিশার বাবা-মার খুনিদের নিরাপত্তা দেয় শিশির।এভাবেই এগিয়ে যায় অগ্নীর কাহিনী।

অগ্নিতে নারী:

অগ্নি ছবিতে নারী চরিত্রগুলো ভাগ করে নেয়া যেতে পারে। প্রথমেই অগ্নির প্রধান চরিত্র তানিশা। তারপর আছে শিশিরের মামী চরিত্রে অভিনয় করেছেন একজন নারী। অন্যদিকে আরও আছে তানিশার মা।

এর মধ্যে তানিশার মা চরিত্রকে ব্যাখ্যা করার মতো উপাদান নেই। সে-ই চরিত্রটিকে বেড়ে উঠতে দেয়নি পরিচালক। চরিত্রটিকে দেখা যায় ফ্ল্যাশব্যাকে। যখন তানিশার বাবা-মাকে হত্যার দৃশ্য দেখানো হয় তখন আমরা তানিশার শৈশবকাল এবং একই সঙ্গে তানিশার মাকে দেখতে পাই। সেই দৃশ্যে তানিশার মার হাতে আত্মরক্ষার জন্য শটগান তুলে দেয় তানিশার বাবা। যদিও এমন দৃশ্যের কোনো উত্তর আমরা পাই না। আমাদের মনে শুধু প্রশ্ন জাগে- তানিশার মা শটগানের মতো শক্তিশালী হাতিয়ার ব্যবহার করতে পারতো?

তানিশার মা চরিত্র এমন প্রশ্নের অবতারণা করে। সে এদিক ওদিট ছুটে বেড়ায়। তারপর তার শরীরে গুলি  লাগলে সে লুটিয়ে পড়ে। অর্থাৎ এ চরিত্রটির বিষয়ে আমরা কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি না।

এবার আলোচনা করে নেই কিশোর তানিশার চরিত্রটি নিয়ে। এ চরিত্রকে শুরুতে ভিতু হিসেবেই দেখানো হয়। তবে সাহসীকতার দিকে সে ক্রমশই এগিয়ে চলে। ছোটবেলায় চোখের সামনে বাবা-মাকে হত্যা করা হয়। তাকে দেখানো হয় কি করে জীবনের সঙ্গে লড়তে হয়। খারাপ সময়কে ভয় না পেয়ে সামনে এগুতে হয়।

বিশেষ করে যখন সন্ত্রাসীরা তার পিছু নেয়, সে বাবার দেয়া মেমোরি কার্ড লুকিয়ে ফেলে মুখের ভেতর। এবং পুলিশ চাওয়ামাত্র বোমি করে সেটি বের করে। এখানে তার বুদ্ধিমত্তার বিষয়টি উঠে আসে।নারী বুদ্ধিমতী।

অন্যদিকে যখন পুলিশ তার পিছু নেয় তখন সে বাসের ডিক্কিতে লুকিয়ে পড়ে। ঢাকায় পৌঁছে ঠিকানা নিয়ে খুঁজে বের করে মামার বাসা।

এসব কিছুর মধ্যে নারী কিশোরকে সাহসী ভূমিকায় দেখানো হয়।নারী একা থাকা মানে মহা সংকট।সমাজে অনেক প্রশ্নের উদয় হয়। অনেক সামাজিক বাধার বিষয় উঠে আসে।

এসব কিছুই ছিল না সিনেমায়। কোনো প্রশ্ন ছাড়াই তানিশা পৌঁছে যায়। স্কুল ড্রেস পরে সে চলে আসে ঢাকায়। তারপার মামার কাছে অগ্নি হওয়ার শপথ নেয়। প্রতিশোধের কথা আসে। বলা যেতে পারে, প্রতিশোধের আগুনে শুধু পুরুষসমাজই নয়, নারীরাও অপ্রতিরোধ্য হতে জানে।

অন্যরকম বিতর্কের প্রশ্ন এসেই পড়ে। নারীকে কেন প্রতিশোধ নিতে খুনী হয়ে উঠতে হবে?

এরপর আলোচনা করা যেতে পারে একজন বিদেশী নারীর চরিত্র নিয়ে। তিনি নায়ক শিশিরের মামী। থাইল্যান্ডের নারী চরিত্রে অভিনয় ছিল সাদামাটা। তবে তার কাজটি সাফল্যের সঙ্গেই শেষ করতে পেরেছেন। তাকে রোমান্টিক দেখানোর একটা চেষ্টা পরিচালকের ছিল। তবে খুব ব্যাখ্যা করার মতো নয়।

যদিও বাঙালি স্বামীর সঙ্গে খাপ খেয়ে যাওয়া নারীর মতই উপস্থাপন করেছেন পরিচালক। এক কথায় বিদেশীর মধ্যেও বাঙালি নারীর যে সরল স্বামীভক্তি তেমনই ছিটেফোটা দিয়ে চরিত্রটি নির্মাণ করা হয়েছে।

অগ্নির যত রূপ:

অগ্নি কখনও খুনী, কখনও ছদ্মবেশী সরলতায় ভরা, কখনও রোমান্টিকতায় ভরা। অগ্নি নামটি ছদ্ম। ছবিজুড়ে নায়িকার নাম তানিশা। সিনেমার একটা সাধারণ ধারণা হলো, নায়িকা হবে আবেদনময়ী। যার দিকে তাকালে দর্শকের হৃদয়ে কাছে পাবার তীব্র আকাঙ্খা তৈরি হবে।

যে পরিচালক যত বেশি কাজটি করতে পারবেন, সে পরিচালক তত বেশি সার্থক। অর্থাৎ সৌন্দর্য এখানে বড় ফ্যাক্ট। এই সৌন্দর্যকে পুঁজি করে চলছে সিনেমা। নারীর সৌন্দর্যকে আজকের সমাজ ব্যবহার করছে বাণিজ্যিক কাজেও।

সৌন্দর্যকে প্রায় সময়ই পুঁজি করে পণ্যের প্রসার ঘটানো হচ্ছে। নৃবিজ্ঞানী সুসান র্যাঙ্কল (২০০৪) দেখিয়েছিলেন, বিশ্বসুন্দরী প্রতিযোগিতার মাধ্যমে আঞ্চলিকভাবে সুন্দর নারীদের বাছাই করে পণ্যের বাজার বিস্তৃত করা হয়। সৌন্দর্যকে বাজারে ফেরি করে প্রতিষ্ঠানের অর্থ আয়— এটা কি নারীর ক্ষমতায়ন? এই দায় কি এই সুন্দর নারীগণ বহন করতে পারবেন?

যাইহোক, আমরা ছিলাম অগ্নির রূপ বর্ণনায়। সিনেমায় নায়িকার চরিত্রের সঙ্গে প্রথমেই তার গেটআপ-মেকআপের কথা আসে। সে ক্ষেত্রে ছবি ১০০ ভাগ সার্থক। নায়িকার জামা-কাপড়, মেকআপ  চরিত্রের সঙ্গে বেশ মানিয়েছে। অ্যাকশান মুভির ক্ষেত্রে নায়িকাকে যেভাবে দেখা দরকার; পরিচালক তার লেন্সের ভেতর দিয়ে সেভাবেই দেখেছেন।

ছবি হচ্ছে একটি যৌথ প্রচেষ্টা। সবার সম্মিলিত কাজের উপর নির্ভর করে ছবির সার্থকতা। সেক্ষেত্রে নায়িকা চরিত্র অভিনয় করা মাহিয়া মাহীর গ্ল্যামার ছিল অসাধারণ। তার নাচের ঢং, এক্সপ্রেশন, অ্যাকশন দৃশ্যগুলোতে নিজেকে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন। অর্থাৎ পরিচালক বাঙালি নারীর অবয়ব থেকে বের হয়ে একটা ওয়েস্টার্ন ধাঁচ তৈরির চেষ্টা করেছেন।

বাঙালি নারী লজ্জাবতী, লাস্যময়ী, রহস্যময়ী

বাঙালি নারী লজ্জাবতী, লাস্যময়ী, রহস্যময়ী। সেসব কিছুই ফুটে উঠতে দেখা যায় না। রহস্যের চেষ্টা করেছে শিশিশের কাছে। কিন্তু সেখানে কিছুটা খেদ থেকে যায়। বাংলা চলচ্চিত্রে নায়িকাকে এমন অ্যাকশান ভূমিকায় বহুবারই দেখা গেছে। কিন্তু ওয়েস্টার্ন অবয়ব দিতে পারেনি কেউ। কখনও এটা ছিল পরিচালকের ব্যর্থতা। কখনও ছিল নায়িকার ব্যর্থতা। এক্ষেত্রে অবশ্য মাহিয়া মাহী এগিয়ে। তিনি নিজেকে গ্ল্যামার এবং সেক্সি ভূমিকায় তুলে আনতে সক্ষম হয়েছেন। যদিও অভিনয়ের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন আছে।

অর্থাৎ ছবিতে মূল চরিত্রকে গ্ল্যামার-সেক্সি দেখানোর চেষ্টা ছিল পরিচালকের। এটি চরিত্রের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে বটে। কিন্তু বাঙালির নারীর অবয়ব ফুটে ওঠেনি পুরোপুরি। নারীকে নারী করে শোকেসে সাজিয়ে রাখতে চায়নি পরিচালক। তিনি নারীর অসম্ভব মূর্তি দেখাতে চেয়েছেন।

বাঙালি সিনেমায় কিংবা নাটকে নারীর যে অসহায় অবয়ব সেখানে অগ্নি ছিলেন না। ছিলেন বৃত্তের বাইরে। বলতে চেয়েছেন, নারীরা চাইলেই লড়তে জানে। নারীদের সাহস দিতে চেয়েছেন হয়ত। কিন্তু সে-ই প্রশ্নটি থেকেই যায়, প্রতিশোধ নিতে গিয়ে নারীকে খুনী চরিত্রে নিয়ে আসাটা কতটা যুক্তিযুক্ত।

পরিশেষ:

অসহায় কিংবা যৌন উত্তেজনার হাতিয়ার হিসেবে চলচ্চিত্রে নারীকে দেখে আমরা অভ্যস্থ। অগ্নি চলচ্চিত্রে মাহীর গ্লেমার সেই উত্তেজনা দিতে সক্ষম হলেও ভালোর দিক তো কম নয়। সিনেমায় নতুনত্ব আনতে হবে। নতুন ঢং আনতে হবে। এমন দাবী নিয়েই দর্শক সিনেমা হলে যায়। সিনেমা হলে দর্শক টিকিট কেটে ঢোকে একমুঠো বিনোদনের আশায়। কিন্তু সেই বিনোদনে পরিচালক কি দিচ্ছেন সেটিও দেখার বিষয়।

অগ্নি ছবির মাধ্যমে শুধু নারীর অবয়বকে তুলে ধারার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু ছবির কাহিনী বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে- পুরানো ধাঁচের গল্প দিয়েই অগ্নি নির্মাণ করা হয়েছে। এমনকি গল্পের চেয়ে অ্যাকশান দৃশ্য বেশি।

চলচ্চিত্রে গল্পকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। সেই পুরানো গল্প! বাবা-মাকে হত্যা করা হয়েছে, নায়ক নেবে প্রতিশোধ। এ কাজটি করতে গিয়ে নায়ক হয় হচ্ছে অপরাধীর একজন কিংবা পুলিশ অফিসার। এ গল্প দীর্ঘদিন রাজত্ব করেছে বাংলা সিনেমায়।

তবে বলার ঢংয়ে কিছুটা পরিবর্তন এনেছেন পরিচালক। নায়কের জায়গায় তিনি বসিয়েছেন নায়িকাকে। সঙ্গে অসাধারণ সিনেমেটোগ্রাফি দিয়ে সিনেমায় দিয়েছেন অন্যরকম প্রাণ। যা দর্শককে মুগ্ধ করবে।

3

ছবি সম্পর্কে তথ্য:

পরিচালক:ইফতেখার চৌধুরী
প্রযোজক: শিষ মনোয়ার
রচয়িতা: এ যে বাবু
অভিনয়ে: মাহিয়া মাহী,আরেফিন শুভ,মিশা সওদাগর,আলী রাজ,ড্যানি সিডক, শিবা শানু
সম্পাদক:তৌহিদ হোসেইন চৌধুরী
স্টুডিও: জাজ মাল্টিমিডিয়া

সংগীত: অগ্নি গানের অ্যালবাম ১০ টি গান নিয়ে গঠিত, সংগীত পরিচালনা করেছেন আদিত, শফিক তুহিন এবং আহমেদ হুমায়ুন. গান গেয়েছেন দিলশাদ নাহার কনা, মিলা, লেমিস, লাবন্য, বলিউডএর গায়ক শান, এবং নীতি মোহন. ছবির টাইটেল গান “সহেনা যাতনা” গেয়েছেন আরেফিন শুভ।

তথ্যসূত্র:

১. উইকিপিডিয়া
২. ফাহমিদুল হক (২০০৮), নারীবাদী চলচ্চিত্র তত্ত্ব: একটি পর্যালোচনা; মুজিব মেহেদী সম্পাদিত ‘নারী ও প্রগতি’।
৩. নাবীল অনুসূর্ (২০১৪), দুরন্ত অগ্নি, বিডিনিউজ
৪. মোহাম্মদ হাসান ইমাম (এপ্রিল-জুন ২০০৯), নারীবাদী সমাজতত্ত্ব: একটি অবলোকন; নতুন দিগন্ত