পুঁজিবাদের আড়ালে ব্লাড ডায়মন্ড!

blood diamond

সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা নিয়ে বহু চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়েছে। সবচেয়ে বেশি হলিউডের চলচ্চিত্রে এসব দাঙ্গার চিত্র ফুটে উঠতে দেখা গেছে। তেমনই একটি ছবি ‘ব্লাড ডায়মন্ড’। এডওয়ার্ড জিকের পরিচালনায় ১৯৯৬ থেকে ২০০১ পর্যন্ত সিয়েরা লিওনের পটভূমিকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছে ব্লাড ডায়মন্ড। এই সিনেমা মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাংবাদিক গ্রেগ ক্যাম্বেল ২০০১ সালে দেশটিতে গিয়ে সরেজমিনে ডায়মন্ড ব্যবসা দেখার পর ২০০২ সালে প্রকাশ করেন তার অন্যতম বই ‘ব্লাড ডায়মন্ড- ট্রেসিং দ্য ডেডলি পাথ অব দ্য ওয়ার্ল্ডস মোস্ট প্রিশিয়াস স্টোন্স’।

ছবির মূল বিষয়

blood-diamond-movieডায়মন্ডকে কেন্দ্র করে এগিয়ে গিয়েছে চলচ্চিত্র। ছবির মূল বিষয়ের মধ্যে ছিল একটি যুদ্ধকে টিকিয়ে রাখছে পুঁজিবাদি সমাজ ব্যবস্থা। যেখানে ব্যবসায়ীক স্বার্থের আড়ালে একটি দেশের লাখ লাখ জনগোষ্ঠীকে ঠেলে দেয়া হয়েছে যুদ্ধের দিকে। সঙ্গে উঠে এসেছে অনেকগুলো চরিত্র। একটি ডায়মন্ড নিয়ে সলোমোন ভ্যান্ডি, ড্যানি আর্চার এবং ম্যাডি বোয়েনের গল্পই উঠে এসেছে চলচ্চিত্রে। তাদের জীবন সংগ্রামকে পত্রিকার পাতায় তুলে আনতে চেয়েছেন ম্যাডি বোয়েনের মাধ্যমে। একজন সাংবাদিকের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বন্ধ করে দিতে পারে একটি জাতির অভ্যন্তরীণ যুদ্ধ। এমন ইঙ্গিত উড়িয়ে দেয়া যাবে না ব্লাড ডায়মন্ড সিনেমাটি দেখার পর।

এই সিনেমার মাধ্যমে পরিচালক দর্শকদের বিশেষ বার্তাও পৌঁছাতে চেয়েছেন । বোঝাতে চেয়েছেন পুঁজিবাদি ব্যবসার লাভ-ক্ষতির আড়ালে বাজি রাখা হয় অসহায় মানুষের জীবন। সেসব বাজিকরেরা পুঁজিবাদী দেশেরই নাগরিক। পরিচালকে এমন সাহসি পদক্ষেপের ভেতর ব্লাড ডায়মন্ড সিনেমার উদ্দেশ্যকে সফলতার সঙ্গেই বিবেচনা করা উচিত বলে মনে হয়।

গল্প বিশ্লেষণ:
Blood Diamond-3 character

ছবির কাহিনী এগিয়ে গেছে সলোমোন ভ্যান্ডির জীবন নিয়ে। সলোমোন একজন জেলে। তার পরিবারে ছিল স্ত্রী, দুই মেয়ে এবং বারো বছরের একটি ছেলে। যে ছেলেকে নিয়ে সলোমোন গর্ব করতো। তার স্বপ্ন ছিল- ছেলে একদিন ডাক্তার হবে।  কিন্তু গৃহযুদ্ধ তার জীবনটাকে ওলটপালট করে দেয়। তাকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হয়। ছেলে চলে যায় বিদ্রোহীদের হাতে।

সলোমোনকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয় ডায়মন্ড সন্ধানীদের দলে। যারা ডায়মন্ডের বিনিময়ে অস্ত্র কিনে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। একদিন সে নদীতে হিরক খণ্ড পেয়ে লুকিয়ে ফেলে। মূলত সেখান থেকেই শুরু হয় গল্প।

ছবির আরেক চরিত্র, ড্যানি আর্চার (লিওনার্দো ডিক্যাপরিও), আরেক আফ্রিকান কালোবাজারী এবং যার সঙ্গে সলোমোনের দেখা হয় কারাগারে। সলোমোনের কাছে ডায়মন্ড আছে, এমন তথ্য জানার পর থেকেই সলোমোনের পেছনে লাগে ড্যানি।

ছবির এক পর্যায়ে হাজির হয় নারী সাংবাদিক চরিত্র। তার নাম ম্যাডি বোয়েন। আমেরিকান এই নারী সাংবাদিক এসেছে গল্পের খোঁজে। যে গল্প একটি গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটাতে সক্ষম। শুরু হয় চলচ্চিত্রের নানান ঘাত-প্রতিঘাত। প্রত্যেকেই জীবনের উদ্দেশ্যে ছুটে বেড়াচ্ছে।

সলোমোনের সন্ধান করছে তার পরিবার-পুত্র, ড্যানি আর্চার সন্ধান করছেন ডায়মন্ড, ম্যাডি সন্ধান করছে গল্পের উপাদান। এবং তারা একে-অপরকে সহযোগিতায় করতে শুরু করে। প্রত্যেকেই একসময় মানবতার ডাকে সাড়া দেন। সবশেষে আর্চারের হাতে ডায়মন্ড চলে আসে। কিন্তু ভাগ্য তার সঙ্গে ছিল না। তাকে হার মানতে হয় জীবনের কাছে। কিন্তু তার সকল শর্ত পূরণ করে সলোমোনকে উপহার দেন তার পরিবার। সঙ্গে ম্যাডিকে গল্পের সমস্ত উপাদান দিয়ে দেন। যেই প্রতিবেদনে নড়ে যায় ডায়মন্ড ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ভ্যান্ডি ক্যাপের ভীত। অবসান হয় একটি যুদ্ধের। শেষ হয় অসাধারণ চলচ্চিত্র ব্লাড ডায়মন্ড।

চলচ্চিত্রের সংকেত:

ব্লাড ডায়মন্ড চলচ্চিত্রে অনেক বিষয় উঠে এসেছে। ডায়মন্ড ব্যবসা, সিয়েরা লিওনের গৃহযুদ্ধ, পুঁজিবাদ সমাজব্যবস্থা এবং শিশুদের দিয়ে গৃহযুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার দৃশ্য।

সলোমোনের ছেলে ডিয়াকে দিয়ে তেমনই একটি শিশু চরিত্রকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন পরিচালক। কীভাবে একটি শিশুকে নানান উপায়ে অস্ত্র নিয়ে মানুষ হত্যায় নামিয়ে দেয়া হয় সে-ই বিষয়টি সাফল্যের সঙ্গে দর্শকে চোখে ধরা দেয়। ছবির শেষ অংশে একটি তথ্যে আমরা দেখতে পাই, ৪ লাখ শিশু সেনা হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিদ্রোহীদের হয়ে যুদ্ধ করছে।

তবে পুঁজিবাদি সমাজের দিকে বিশেষ ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে সিনেমার মাধ্যমে। দক্ষিণ আফ্রিকায় খনিজ সম্পদ থাকা সত্তেয় তারা সেসব সুযোগ নিতে পারছে না। নিচ্ছে পশ্চিমা দেশগুলো। তাদের জুয়া খেলার টেবিলের নিচে লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রাণ দিচ্ছেন। যে ডায়মন্ড বিশ্ব বাজারে বিক্রি হচ্ছে, সেই ডায়মন্ড বিক্রি একটি দেশের যুদ্ধকে চালিয়ে যাওয়ার জন্যই অর্থায়ন করা। এমন তথ্য খুব সরাসরি সিনেমায় প্রবেশ করানো হয়।

blooddiamondঅন্যদিকে সাংবাদিক ম্যাডি বোয়েন একজন সাংবাদিক। ম্যাডি এক জায়গায় আর্চারকে বলেন, আমি রিপোর্ট লিখবো, কত জন মানুষ মারা গেল, কিভাবে মারা গেল, কতজন শিশু অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করছে এসব নিয়ে। সঙ্গে একটি ছবিও পাঠাতে হবে। কিন্তু তাতে কি লাভ? আমি তো এই ভয়াবহতা বন্ধ করতে পারছি না।

অর্থাৎ সাংবাদিকদের দিকে গভীর দৃষ্টি দিয়েছেন পরিচালক ও রচয়িতা। তারা সাংবাদিকদের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের শক্তির উদাহরণ দেখাতে চেয়েছেন। তাদের কলমের জোরে একটি দেশের যুদ্ধ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এমনই ইঙ্গিত আছে সিনেমায়।

ছবির ধরণ:

ব্লাড ডায়মন্ডকে ‘পলিটিক্যাল থ্রিলার’ ছবি বলা যেতে পারে। কারণ পলিটিক্যাল ছবিতে রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের একটি বিষয় যুক্ত থাকে। যার সঙ্গে যোগ হয় দুর্নীতি, সন্ত্রাসী, যুদ্ধ, পুজিবাদী স্বার্থ। এমনকি রাজনৈতিক কুটচালের উপর সত্যঘটনায় নির্মিত ছবিকেও পলিটিক্যাল থ্রিলার ছবির আওতায় নিয়ে আসা যায়।

সবশেষে বলতে হয়, ছবির কারিগরি দিক নিয়ে মন্তব্য করার মতো কিছু নেই। ছবির চিত্রগ্রাহক এডোয়াডো সারা দুর্দান্ত কাজ করেছেন। দৃশ্য নির্ধারণের ক্ষেত্রেও পরিচালক দক্ষতা দেখিয়েছেন। তবে বেশ কয়েকবার সূর্য ডুবে যাওয়ার দৃশ্য অনেকটা বেমানান এবং কখনও অপ্রয়োজনীয় মনে হয়েছে ছবিতে।

লিওনার্ডো ডিক্যাপ্রিও, জেনিফার কনেলি, জিমন হানসের অভিনয় ছিল অসাধারণ। তাদের অভিনয় ছবিতে অন্যরকম প্রাণের সঞ্চার করতে পেরেছে। সে ক্ষেত্রে ব্যাবসায়ীক-পলিটিক্যাল থ্রিলার সিনেমা হিসেবে ২০০৬ সালেই সুনাম কুড়িয়েছে ‘ব্লাড ডায়মন্ড’।