বিচারে-বিশ্লেষণে ‘আকাশ কত দূরে’

Akash Koto Dureচলচ্চিত্র সমালোচনা বিষয়টি খুব খারাপ। পরিচালকের তীব্র সংগ্রামের মধ্যেই তৈরি হয় একটি সিনেমা। অনেক কষ্ট-হতাশা-ক্ষোভ-পরিশ্রম থাকে সিনেমায়। কিন্তু সিনেমাহল থেকে বের হয়ে কোনো দর্শক যদি বলে বসে, ‘নাহ্ ছবি জমে নাই’। তখন যেন পরিচালকের সব শ্রমই বৃথা গেল!

২০১৪ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি মুক্তি পায় সামিয়া জামান পরিচালিত চলচ্চিত্র ‘আকাশ কত দূরে’। এটি সামিয়া জামানের দ্বিতীয় চলচ্চিত্র। সরকারি অনুদানে তার প্রথম শিশুতোষ চলচ্চিত্র।

সিনেমাটি তৈরিতে সহযোগী হয়েছেন ইমপ্রেস টেলিফিল্ম ও ভার্সা মিডিয়া। জুলফিকার রাসেলের রচনা ও চিত্রনাট্যে তৈরি হয়েছে আকাশ কত দূরে।

গল্প সংক্ষেপ:
মূল গল্পে কখনও চলচ্চিত্র নির্মাণ হয় না। রচনা করার পরপরই সে গল্পের নতুন নির্মাতা হয়ে যান পরিচালক। অর্থাৎ চলচ্চিত্রের মূল খেলোয়াড় পরিচালক।

চলচ্চিত্র সমালোচনাও সামাল দিতে হবে পরিচালককে। প্রতিটি শট এবং গল্প তুলে ধরার স্টাইলটা পরিচালকের অবিস্কার।

যাইহোক, আকাশ কত দূরে সিনেমার গল্পটি অল্প কথায় সেরে ফেলা যাক।

সিনেমার মূল চরিত্র বিচ্ছু নামে এক কিশোর। তাকে নিয়েই এগিয়ে চলে গল্প। এক অসহায় শিশুর জীবনে বাস্তবতার যে সব আঘাত বর্তায় সেসব খুব চমৎকারভাবে উঠে আসে এই ছবিতে। বিশেষ করে, এতিমখানায় নির্যাতনের দৃশ্যও ফুটে ওঠে।

ছবিতে পরিচালক খুব সুক্ষ্মভাবে একটি শিশুর বিপ্লব দেখিয়েছেন। যখন নির্যাতন সইতে না পেরে বিচ্ছু পালিয়ে যায় তখন আমরা একটি শিশুর বিপ্লবী চেতনাকে দেখতে পাই। তার কাছে প্রতিবাদের ভাষা ছিল দেয়াল টপকে চলে যাওয়া।

শুরু হয় বিচ্ছুর শহুরে সংগ্রামের জীবন। যেখানে উঠে আসে শিশু অপরাধের নানান দৃশ্য। বিচ্ছুর জীবনের মোড় ঘুরানো দেখতে পাবে দর্শক। সঙ্গে অন্যান্য চরিত্রগুলো খেলা করবে চলচ্চিত্রে। কখনও পরী-আরিফের প্রেম, কখন রাজ্জাক এবং শর্মিলা আহমেদের দুর্দান্ত অভিনয় এবং নানান বাস্তবতায় বিচ্ছুকে নিয়ে ক্লাইমেক্সগুলো দর্শকদের কাছে টেনে নেবে।

মুন্সিয়ানা:
চলচ্চিত্রের অনেক কাজে মুন্সিয়ানা ছিল। বিশেষ করে বিচ্ছু চরিত্রে ছেলেটির অভিনয়ে পরিপক্কতা দেখা গেছে। অন্যদিকে রাজ্জাক এবং শর্মিলার অভিয়ের প্রশংসা আগেই করেছি।

_DSC7141

অভিনয়ের বাইরেও পরিচালকের শট সিলেকশনে মুন্সিয়ানা ছিল। রোমান্টিক গানের পিকচারাইজেশন অসাধারণ ছিল। গানগুলো দেশি স্পটগুলো বেছে নেয়ার জন্য পরিচালককে ধন্যবাদ। আমাদের দেশের অনেক সুন্দর জায়গা থাকতেও সম্প্রতি সময়ে অনেক পরিচালকে দেখা যায় বিদেশে গানের পিকচারাইজেশন করছে। নিজের দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে দেশিয় চলচ্চিত্রে তুলে আনার প্রয়াসের জন্য সামিয়া জামানকে ধন্যবাদ।

মুন্সিয়ানা ছিল শিশু অপরাধ তুলে ধরার দৃশ্যগুলোতেও।  শিশুদের ছিনতায়ের ট্রেনিংয়ের দৃশ্যে বাস্তবতার ছাপ ছিল। পরী চরিত্রের প্রবাসী বাঙালি সেজে মানুষ ঠকানোর গল্পটিতেও বাস্তবতার ছাপ পাওয়া যাবে।

সবকিছু মিলিয়ে জুলফিকার রাসেলের চিত্রনাট্য ও রচনাকে এক অর্থে অসাধারণ বলা চলে। গল্পে ক্লাইমেক্স কিংবা ট্র্যাজিডি ছিল। হাস্য-রসাত্মক বিষয়গুলোও তুলে আনার উপাদান ছিল। পরিচালক এ বিষয়গুলো ফুটিয়ে তুলেছেন আপন তুলিতে।

 চরিত্র বিশ্লেষণ:

প্রথমেই বলেছি শিশুতোষ চলচ্চিত্র হলেও আকাশ কত দূরের প্রধান চরিত্র বিচ্ছু একজন কিশোর। তার কৈশোর জীবনের অনেক গল্প একসঙ্গে পরিচালক বলতে চাননি। এখানে অবশ্য পরিচালক বুদ্ধিমানের কাজ করেছেন। একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের দিকে তিনি ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে চেয়েছেন। এতিমখানার অত্যাচার নির্যাতনগুলো সংক্ষেপ হলেও তুলে ধরতে পেরেছেন পরিচালক। ধীরে ধীরে তিনি যেতে চেয়েছেন শিশু অপরাধ জগতে।

IMG_4903এতিমখানায় বিচ্ছুর বন্ধুর চরিত্রকেও খুব একটা এগিয়ে যেতে দেখা যায়নি। সেই বন্ধু এতিমখানা থেকে বিচ্ছুকে পালিয়ে যেতে সহায়তা করে।

আকাশ কত দূরে সিনেমার কয়েকটি চরিত্রকে অনেকটা রহস্যের মধ্যেই রেখে দিয়েছেন পরিচালক। যেমন, বিচ্ছুর মায়ের চরিত্র। ছবি থেকে জানা যায় বিচ্ছুর বাবা-মার বিয়ে হয়। বিচ্ছুর বাবা ইমরান ছিল জাহাজের ক্যাপ্টেন। ইমরান বাবা-মাকে না জানিয়ে বিয়ে করে ফেলে। তারপর সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। কিন্তু ইমরানের স্ত্রী বাংলাদেশের এক গ্রামের পথে কি করে আসলো? এমন প্রশ্ন নিয়ে বিচ্ছুর মা চরিত্রটি রহস্যের মধ্যে আটকে থাকে। আমরা কখনও এর উত্তর জানতে পারি না।

অন্যদিকে পরী চরিত্রটি নিয়েও ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের প্রয়োজন আছে। সে বিষয়ে পরে আসছি। কিন্তু আপাতত বলে রাখছি পরী কি করে অপরাধ জগতে আসলো সে বিষয়ে কোনো চিহ্ন বা ক্লু রাখেনি পরিচালক। যদিও শেষের দিকে ওস্তাদের দোহাই দিয়ে কিছুটা সামাল দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।

পুরো ছবিতে দুটি চরিত্র যথার্থভাবে বিশ্লেষণ করতে সক্ষম হয়েছেন পরিচালক। বিচ্ছু এবং রাজ্জাকের চরিত্রটি। এমনকি সিনেমায় অভিনয়ের দুর্বলতা জায়গাগুলো পূরণ করে দেন রাজ্জাক এবং শর্মিলা। তাদের দুজনের দুর্দান্ত অভিনয়ে ছবিতে অন্যরকম প্রাণের সঞ্চার হয়।

যে চরিত্রগুলো নিয়ে অনেক খেলার সুযোগ ছিল তার মধ্যে অন্যতম ছিল পরী। কিন্তু  এই চরিত্রটি সিনেমায় শুধু কিছু অপরাধ দেখানোর জন্যই আনা হয়েছে বলে মনে হয়। এছাড়াও পরিচালকের আরো একটি উদ্দেশ্য ছিল। আবারও বলছি, পরীকে নিয়ে ঢের আলোচনা করার আছে।

বুলেটসহ অন্যান্য চরিত্রগুলো তাদের কাজ ঠিকভাবেই করতে পেরেছে। এ চরিত্রগুলো ডিফাইন করা না গেলেও এদের নির্দিষ্ট কাজের মধ্যেই আবিষ্কার করে নেয়া যায়।

পরী ও রোমান্টিকতা:

DSC_0029বাংলা সিনেমার নায়িকারা হবে আবেদনময়ী। তাদের কথায়, চলনে বলনে থাকবে অন্যরকম অবেদন। কবিতার মতো ফুটে উঠতে জানবে নায়িকার চরিত্র। মানুষের মনের তীব্র আকাঙ্খার জায়গায় স্থান করে নিতে পারে যে চরিত্র। সে-ই নায়িকা চরিত্র। অন্তত পুরষতান্ত্রিক সমাজে এমন আকাঙ্খাই ফুটে ওঠে।

পরীকে তেমনই আবেদনময়ী জায়গায় দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছেনে পরিচালক। তীব্র চেষ্টা ছিল আবেদন তৈরি করার। এমনকি পেরেছেনও। তার পরিপাটি জামা, গোছানো চুল, সেলোয়ার কামিজ পরার ঢং সবকিছুর মধ্যে উত্তেজনার আবহ সৃষ্টির চেষ্টা ছিল।

প্রথমত হচ্ছে- পরী কে? এমন প্রশ্নের উত্তর নেই। তবে পরী অপরাধ চক্রের একজন। সে তার দলে সবচেয়ে বেশি টাকা হয়তো(!) এনে দেয়। এজন্যই ওস্তাদ তার প্রতি সমীহ দেখায়। কিন্তু পরীর চরিত্র অনুযায়ী তার সাজগোজ, কথা বলার স্টাইল অনেকটাই বেমানান মনে হয়েছে।

সারাক্ষণ সেজেগুজে বসে থাকা পরীর ভাষায় “আইছি, খাইছি, গেছি” যেমন ছিল তেমন “এসেছি,  খেয়েছি, গিয়েছি” জায়গা পেয়েছে। কিন্তু কখনও এক জায়গায় আটকে থাকতে পারেনি পরীর ভাষার ব্যবহার। এবিষয়টিকেও সামাল দেয়ার চেষ্টা করেছেন পরিচালক। তিনি বুলেটকে দিয়ে ভাষা ব্যবহারের প্রশ্ন করেছেন।

পরী বিদেশি সেজে মানুষ ঠকায়। এই অপরাধ চমৎকারভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। সাজগুজে অনেক মুন্সিয়ানা ছিল।

অন্যদিকে আকাশ কত দূরে ছবিটিকে শিশুতোষ চলচ্চিত্র বলা হলেও এর মধ্যে প্রবেশ করানো হয়েছে রোমান্স। শিশুতোষ চলচ্চিত্রে প্রেম থাকবে না, সেটি নিয়ে-তো আর নিয়ম-নীতি নেই।

পরী চরিত্রের উদ্দেশ্য ছিল দুটি। একটি হলো- অপরাধ জগৎ তুলে ধরার প্রয়াস। দ্বিতীয়টি ছিল- ছবিতে রোমান্স ঢুকিয়ে দেয়া।

ছবির চিত্রনাট্য ও সংগীত মন্তব্য:

ছবির গল্পে কোনো খেদ নেই। এটি নিয়ে সন্দেহও নেই। গল্পের প্লটে ক্লাইমেক্স ছিল। বিচ্ছু চরিত্রকে নিয়ে খেলার অনেক সুযোগ ছিল।

শিশু অপরাধ দেখানোর কথা মনে হলেই চোখে ভাসে হলিউডে নির্মিত ‘স্লামডগ মিলিনিয়ার’ ছবিটি। এজন্য বিচ্ছুকে নিয়ে অনেক কাজ করার অসংখ্য সম্ভবনা ছিল ছবিতে। চিত্রনাট্যে সবগুলো উপাদানই ছিল।

গানগুলোর প্রশংসা করতেই হয়। বিশেষ করে বিচ্ছু যখন ট্রেনে করে ঢাকার পথে রওনা হয় তখন সে গানটি দর্শক হৃদয়ে আঁচড় কেটে যাবে।

পরিশেষ:

শেষ করার আগে ছবির সমাপ্তি নিয়ে কথা বলতে হয়। ছবি শেষ হয় বিচ্ছুর স্কুলে যাওয়ার গল্প দিয়ে। জানা যায়, অনুদানের ছবিতে হ্যাপি এন্ডিং থাকতে হয়। তবে এন্ডিংয়ে জোর করে হ্যাপি করার কোনো চেষ্টা করেনি পরিচালক। গল্পের শেষটা সুন্দর করেই ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন পরিচালক সামিয়া জামান।

পরিশেষে বলতে হয়, বাংলাদেশের অধিকাংশ ছবিগুলোই রোমান্টিক-বাণিজ্যিক ধারার। অথবা রোমান্স-অ্যাকশন দুটোই থাকে। এমন সময়ে শিশুতোষ চলচ্চিত্র নিয়ে সামিয়া জামান হাজির হয়েছেন।

যেখানে বাংলাদেশে শিশুতোষ চলচ্চিত্র তৈরিই হচ্ছিল না; ঠিক সে-সময় আকাশ কত দূরে। তবে উল্লেখ করার মতো বিষয় হলো, এই ছবিটিকে শিশুতোষ-বাণিজ্যিকধারার ছবি বললে ভুল হবে না। সামাজিক গল্প, শিশু অপরাধ, এতিমখানার হালচাল, অপরাধ জগত, রোমান্স সবকিছুই আছে সিনেমায়। সেক্ষেত্রে ‘আকাশ কত দূরে’ অনবদ্য।