ফাহমিদুল হক ও প্রণব ভৌমিকের তারেক মাসুদ পাঠ

Tareq Masudচলচ্চিত্র নির্মাতা তারেক মাসুদ সম্প্রতি সময়ে গবেষণার বিষয় হয়ে উঠেছেন। তারেক মাসুদকে নিয়ে গবেষণার কারণও আছে বৈকি। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে ভিন্ন মাত্রা যোগ করা নির্মাতাদের মধ্যে তারেক মাসুদ ছিলেন উজ্জ্বল নক্ষত্র।

তারেক মাসুদকে নিয়ে ২০১৪ সালের বই মেলায় প্রকাশিত হয়েছে তেমনই একটি গবেষণাগ্রন্থ। এটি প্রণব ভৌমিকের মাস্টার্স থিসিসের ভিত্তিতে রচিত বলেই জানা যায়। তার তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন ফাহমিদুল হক।

শিক্ষক ফাহমিদুল হকই থিসিসটিকে সম্পাদনা ও পরিমার্জনা করে বইয়ে রূপ দিয়েছেন। বইটির নাম দিয়েছেন ‘তারেক মাসুদ জাতীয়তাবাদ ও চলচ্চিত্র’। রচনায় ফাহমিদুল হক এবং প্রণব ভৌমিক

যৌথ প্রয়াসে বইটি রচিত হলেও গবেষণার মূল কাজটি অবশ্য প্রণব ভৌমিক করেছেন বলে ধরে নেয়া যায়।

বইটিতে তারেক মাসুদ নির্মিত মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্রে জাতীয়বাদ ও জাতীয় আত্মপরিচয় নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করা হয়েছে।

তারেক মাসুদের চলচ্চিত্র নিয়ে আলোচনার পূর্বে তাত্ত্বিক আলোচনা করা হয়েছে। ‘আত্মপরিচয় ও জাতীয়বাদের পুনর্পাঠ’ অধ্যায়ে বাংলাদেশের জাতীয়তাবাদের নানান ধারা নিয়ে আলোচনা করেছেন গবেষকবৃন্দ। তাদের মতে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রে বসবাসকারী বাঙালি মুসলমানদের আত্মপরিচয় অনুসন্ধান করতে গেলে পাওয়া যাবে ৩টি ধারা। সেগুলো হলো- বাঙালিত্ব, মুসলমানিত্ব ও লোকধর্ম।

এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে গবেষক ফাহমিদুল হক এবং প্রণব ভৌমিক চমৎকার একটি আলোচনার উদ্রেক করেন। তারা বলেন,

…বাঙালি মুসলমানের কাছে এই দ্বৈধতার প্রশ্নটি বরাবরই ঘুরেফিরে এসেছে যে আমি মূলত কে, বাঙালি না মুসলমান? বাঙালিত্বে বিশ্বাসী যে সে তার মুসলমানিত্ব খারিজ করতে পারলে যেন বাঁচে, আর মুসলমানিত্বে যে বিশ্বাসী, সে মনে করে বাঙালিপনা হলো হিন্দুয়ানি ব্যাপার। অথচ দুটোরই এমন জাতিগত ও ঐতিহাসিক সভ্যতা আছে যে কোনোটিকেই পুরোপুরি বাদ দেয়া চলে না, সম্ভবও নয়।…

এসব আলোচনা আরও জমানোর জন্য বাঙালিত্ব, মুসলমানিত্ব, ইসলামী সংস্কার আন্দোলন, ব্রিটিশ নীতি, হিন্দুত্ববাদ, লোকধর্ম সমূহ, বৌদ্ধ তান্ত্রিকতা, সুফিবাদ, বৈষ্ণববাদ, বাংলার বাউল নিয়ে ইতিহাস ও বিভিন্ন প্রেক্ষাপট উঠে আসে বইয়ে। এসব আলোচনা তারেক মাসুদ এবং তার চলচ্চিত্রে জাতীয়বাদ বুঝতে আমাদের সহায়তা করে।

গবেষণামূলক পুস্তকে তারেক মাসুদের চারটি চলচ্চিত্র নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। চলচ্চিত্রগুলো হলো- মুক্তির গান, মুক্তির কথা, মাটির ময়না, নরসুন্দর

মুক্তির গানের মধ্যে বাংলাদেশের মানুষ দেখতে পেয়েছে মুক্তিযুদ্ধের রূপ। যে রূপ ১৯৭৫-এর পর বাঙালি জাতি দেখতে পায়নি। লিয়ার লেভিনের ১৬ মিমি ক্যামেরা দিয়ে ধারণ করা ২০ ঘণ্টার ফুটেজ দিয়ে তারেক মাসুদ ঠাঁই করে নিয়েছেন ইতিহাসে।

একবার ক্যাথরিন মাসুদের সাক্ষাৎকারে তিনি আমাকে লিয়ার লেভিনের সঙ্গে পরিচয়ের ঘটনাটি বলেছিলেন। সেই সাক্ষাৎকারে আমি জানতে পারি- তারেক মাসুদ লিয়ার লেভিনকে ফোন করে বলেন, আমরা শুনেছি আপনার কাছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের কিছু ফুটেজ আছে।  এই বিষয়টি নিয়ে আমি আগ্রহী।

লিয়ার লেভিন অত্যন্ত খুশী হলেন এবং বললেন,  বিশ বছর ধরে আমি এই ফোন কলটির জন্য অপেক্ষা করছিলাম।

যাইহোক, এই আলোচনা বই আলোচনা। তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা জরুরী। বইয়ের পরবর্তী অনুচ্ছেদগুলোতে চারটি চলচ্চিত্রের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। ছবিগুলোর নির্মাণশৈলি নিয়ে খুব একটা আলোচনা হয়নি।

নির্মাণশৈলি বিষয়টি গবেষণার অংশও নয়। গবেষণার অংশ জাতীয়তাবাদ। গল্পের ভেতর কিংবা চলচ্চিত্রের ফুটেজগুলোর মধ্যে কিভাবে জাতীয়তাবাদ ফুটে উঠেছে সেগুলো নিয়েও আলোচনা করার চেষ্টা আছে গবেষণায়।

যেমন, মুক্তির গানকে প্রামাণ্যচিত্র তত্ত্ব অনুযায়ী বলা হয়েছে বর্ণনামূলক প্রামান্যচিত্র।তবে তারেক মাসুদ নিজে বলেছেন, এটি কোনো প্রামাণ্যচিত্র নয়, এমনকি কাহিনীচিত্র নয়, আমরা এই দুইয়ের মিশ্রণে ছবিটিকে তৈরি করেছি, ইংরেজিতে যাকে বলে ন্যারেটিভ ডকুমেন্টরি (মাসুদ: ২০১৩:৩৫)।

এক্ষেত্রে জাকির হোসেন রাজুর একটি বক্তব্যকে টেনে আনেন গবেষক। জাকির হোসেন রাজু এক বয়ানে বলেন, লিয়ার লেভিন মুক্তির গান-এর ফুটেজ ধারণ করেছেন অনেকটা ডিরেক্ট সিনেমার মতো করে। ঘটনাকে পর্যবেক্ষণ করে গেছেন তিনি। কিন্তু তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদ চলচ্চিত্রে বিভিন্ন দৃশ্য ও শব্দযোগ এবং সেগুলো সৃজনশীল সম্পাদনা করে নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গি যোগ করেছেন। ‘সত্য নির্মাণের জন্য সৃজনশীল কৃত্রিমতার আশ্রয় নিয়েছেন (রাজু, ২০১১:৩৬)’।

মুক্তির গান নিয়ে সবচেয়ে চমৎকার মন্তব্য উঠে আসে গবেষণায়। গবেষকেরা পর্যবেক্ষণ করে দেখেন, বিভিন্ন উৎস থেকে প্রাপ্ত বিভিন্ন ফরমেট ও কালার টোনের এসব ফুটেজের সমাহারে মুক্তির গান নির্মিত হলেও এসব দৃশ্যের কালার কারেকশন এমনভাবে করা হয়েছে যা চলচ্চিত্রটি দেখার সময় একটি একক চলচ্চিত্রের অনুভূতি জাগায়।

এ বক্তব্যটিকে অবশ্য আমরা কারিগরি দিকের আলোচনা হিসেবে মনে করতে পারি।

এভাবেই মুক্তির কথা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। মুক্তির কথাকে বলা হয়েছে কথ্য ইতিহাস বা ওরাল হিস্ট্রি। সারাদেশে মুক্তির গান চলচ্চিত্র দেখাতে গিয়ে প্রদর্শনকারী দলগুলো কী ধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয় তা নিয়েই চলচ্চিত্রটির কাহিনী।

তবে মুক্তির গান এবং মুক্তির কথা চলচ্চিত্রের চেয়ে গবেষকদের তাত্ত্বিক আলোচনার পূর্ণ প্রকাশ পেয়েছে মাটির ময়না এবং নরসুন্দর চলচ্চিত্র আলোচনায়।

বিশেষ করে মাটির ময়না চলচ্চিত্র নিয়ে আলোচনায় বাঙালি বনাম মুসলমান জাতীয়তাবাদ নিয়ে অসাধারণ আলোচনা করতে সক্ষম হয়েছেন গবেষক। অবশ্য এজন্য বলতে হয়, মাটির ময়না ছিল তারেক মাসুদের নিজস্ব স্ক্রিপ্টে রচিত চলচ্চিত্র। এবং বাঙালি ঐতিহ্যের অনেক বিষয়াদি চলচ্চিত্রে ফুটে উঠতে পেরেছে। অন্যদিকে নরসুন্দর চলচ্চিত্রে তেমন উপাদান লক্ষ্য করা গেছে।

লক্ষ্য করার মতো বিষয় হলো, তারেক মাসুদের চলচ্চিত্রগুলোকে গবেষকবৃন্দ আবিষ্কার করেছেন বহুমাত্রিক হিসেবে। মুক্তিযুদ্ধ ছিল বহুমাত্রিক। সে বিষয়টিকে গবেষণায় বের করে আনার চেষ্টা করেছেন।

অন্যদিকে গবেষণাগ্রন্থটির যে জায়গাটি সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে তা হলো ‘জাতীয়তাবাদের পরিবেশনা’ অধ্যায়ে। এ অধ্যায়ে অসাধারণ একটি ভাবনার দিকে তীর ছুড়েছেন গবেষকবৃন্দ। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস কয়েকবাক্যে বলতে বললে মানুষ কি বলে? সরাসরি যুদ্ধ নিয়েই আলোচনা বেশি হয়। আবার নারীদের কথা আসলেই বলা হয়, দুই লক্ষ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে স্বাধীনতা।

এদিকে নজর দিয়েছেন উভয় গবেষক। তারা বের করে এনেছেন তারেক মাসুদ এসবের দিকে তাকিয়েছেন ঠিকই। কিন্তু বের করার চেষ্টা করেছেন মুক্তিযুদ্ধে অন্য মাত্রাকে।

যেমন, মুক্তির গান-এ তিনি সংস্কৃতিকর্মীদের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ দেখিয়েছেন, মুক্তির কথায় আদিবাসীদের কথা উঠে এসেছে, মাটির ময়নায় বিভিন্ন জাতীয়তাবাদী মতবাদ কীভাবে একে অন্যের সাথে আন্তঃক্রিয়ায় লিপ্ত রয়েছে সে চিত্র দেখা গেছে। অন্যদিকে নরসুন্দর-এ উর্দুভাষী বিহারি সমাজের মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীতা করার প্রসঙ্গ উঠে আসতে দেখা যায়।

বইয়ের শেষ অধ্যায়ে যুক্ত হয়েছে তারেক মাসুদের সাক্ষাৎকার।

চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ জাতীয়তাবাদ ও জাতীয় আত্মপরিচয় নিয়ে গভীরভাবে ভেবেছেন।

তার মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক চলচ্চিত্রগুলোতে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে রয়েছে। এই গবেষণাগ্রন্থে তারেক মাসুদের জাতীয়তাবাদ-বিষয়ক চিন্তাকে অনুধাবন করার চেষ্টা করা হয়েছে।

এককথায় বলতে গেলে, জাতীয়তাবাদ ধারণায় তারেক মাসুদ কোনো ক্ষুদ্র বা বিশেষ জায়গায় আবদ্ধ থাকেনি। প্রতিটি চলচ্চিত্রে তিনি নতুন বৃহত্তর সত্যের দিকে ধাবিত হয়েছেন, দর্শকদের ধাবিত করেছেন।

  • তারেক মাসুদ জাতীয়তাবাদ ও চলচ্চিত্র
  • ফাহমিদুল হক, প্রণব ভৌমিক
  • আগামী প্রকাশনী
  • প্রচ্ছদ: শিবু কুমার শীল
  • দাম: ২৮০