বিধান রিবেরুর শাহবাগ ভাবনা

…ধর্মকে ব্যবহার করিয়া স্বার্থসিদ্ধি বা সাম্প্রদায়িকতা ছড়ানোর কুৎসা মতলবটা-পুনর্পাঠের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করি। যাহাতে ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ের মতলববাজদের চরিত্রের সঙ্গে আজিকার মতলববাজদের চেহারা মিলাইয়া লওয়া যায়, যাহাতে ইতিহাসের করুণ দিকটার সঙ্গে আজিকার অগ্রগতিকেও কটাক্ষ করা যায়…

Shahbagধর্মকে রাজনীতিতে ব্যবহার প্রসঙ্গে তুলে বিধান রিবেরু তার “শাহবাগ রাজনীতি। ধর্ম। চেতনা” বইয়ে এভাবে সাম্প্রদায়িকতার নিয়ে বয়ান দেন।

বিধান রিবেরু বেশ সূক্ষভাবেই ইতিহাস পাঠ করেছেন বলে মনে হয়। তা না হলে রাজনীতিতে ধর্ম ও সাম্প্রদায়িকতার ব্যবহার নিয়ে ব্রিটিশ হতে বর্তমান আমল পর্যন্ত মুসাবেদা করতে পারতেন না। তিনি তার বইয়ে একপ্রান্তে উল্লেখ করেন,

“১৮৫০ সালের দশকে অযোধ্যা, লখনৌ ও বঙ্গদেশসহ নানা জায়গায়, বিংশ শতাব্দী শুরুর আগে ও পরে এই হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা চলিয়াছে। ১৯১০ সালে পেশোয়ার, ১৯১২ সালে অযোধ্যা-ফৈজাবাদ, ১৯১৩ সালে আগ্রা, এমনকি এসায়ি ১৯৯০ সালে আসিয়াও সাম্প্রদায়িক হানাহানি থামে নাই বরং তা বিরামহীনভাবে চলিয়াছে। (বন্দ্যোপাধ্যায় ১৪০৪: ৩-২৮)।”

বিধান একজন গবেষক। তার লেখার ধরণ দিয়ে আমরা ধারণা করতে পারি। তার লেখার ধরণে গঠনে রয়েছে গবেষণার লক্ষণ। সকল ঘটনার সাল মাস তিনি উল্লেখ করেছে। সঙ্গে দিয়েছেন দোহাই।

প্রথম অধ্যায়ে তিনি ইতিহাস নিয়া আলোচনা করেছেন। ইংরেজ, পাকিস্তান, স্বাধীনতার পর, বঙ্গবন্ধুর আমল, জিয়ার আমল, এরশাদের আমল, খালেদা-হাসিনা- সব আমলেই যে হিন্দু-মুসলমান রাজনীতির হাতিয়ারে ব্যবহৃত হয়েছে, সে বিষয়েই আলোচনার মজলিস এই বইয়ে।

সর্বশেষ শাহবাগ গণজাগরণ কেন্দ্র করে সাম্প্রদায়িকতার ঘটনা নিয়েও তিনি আলোচনা করেন। শাহবাগ নিয়া ফেসবুকে ‘বাঁশের কেল্লা’ কিভাবে ধর্মকে ব্যবহার করেছে সেসব বিষয়ও উঠে এসেছে বইয়ে। আলোচনার ফাঁকে তিনি তথ্য-উপাত্তও তুলে ধরেন।

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায়ে জামায়াতের নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায়ের পর সাম্প্রদায়িক সহিংসতা দেখা দেয়। প্রথম আলোর উদ্ধৃতি দিয়ে বিধান তথ্য-উপাত্ত হাজির করেন। সেখানে দেখা যায়, পয়লা মার্চ থেকে ২৪ মার্চ পর্যন্ত ৩১৯টি মন্দিরে হামলা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় জামায়াত শিবিরের তাণ্ডবে রায় ঘোষণার দিন হতে ২১ মার্চ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন জায়গায় হরতাল ও সহিংসতায় মারা যায় ৮১ জন মানুষ। যার মধ্যে ৮ জন পুলিশ এবং ৩৫ জন সাধারণ মানুষও রয়েছেন।

ইতিহাসের ভেতর দিয়ে ঘুরে বেড়ার চেষ্টা করেছেন বিধান। মিলিয়েছেন অতীতের সঙ্গে বর্তমানের। বুঝিয়ে দিয়েছেন কোনো কালই সাম্প্রদায়িকতার হামলা থেকে রক্ষা পায়নি। বরং ধর্ম বারবার রাজনীতিতে ভোটের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার হয়েছে।

উদাহরণ হিসেবে তিনি গণজাগরণকে টানেন। একটি যৌক্তিক দাবিকে কিভাবে আস্তিক নাস্তিকের রূপ দেওয়া হয় সে ঘটনাও তুলে ধরতে ভুলে যাননি বিধান। শুধু তা-ই নয়, শাসকগোষ্ঠী আওয়ামী লীগ নিজেদের ধর্মকে প্রমাণ করতে নাস্তিকতার অজুহাতে তিন ব্লগারকে গ্রেফতার করে। তাও উঠে এসেছে বইয়ে।

বইয়ের মধ্যভাগে শাহবাগের রোজ নামচা চর্চা করেছেন বিধান রিবেরু। শুরু হয়েছে ১২ ফেব্রুয়ারি থেকে। এক পর্যায়ে উল্টো বুদ্ধির বুদ্ধিজীবী ফরহাদ মজহারকে লেখায় এনেছেন বিধান।

ফরহাদ মজহারকে একটি খোলা চিঠিও লিখেন। এই অধ্যায়গুলোকে মনে হয়েছে না থাকলেও চলতো। ফরহাদ মজহারের মতো ব্যক্তিকে নিয়া তিনটি রচনার কোনো প্রয়োজনবোধ হয়নি। তবে গবেষণার দৃষ্টিকোন থেকে বিধান রিবেরু পার পেয়েছেন। ভালো-মন্দ দুদিককে তুলে ধরতে গিয়েই হয়তো মজহারের প্রতি অধিক দৃষ্টি দিয়েছেন।

বিধানের বইয়ের শাহবাগের চেয়ে আন্দোলন নিয়ে ধর্ম প্রপাগান্ডা বেশি গুরুত্ব পেয়েছে বলেই মনে হয়। আমার দেশ, হেফাজতে ইসলাম সবকিছু নিয়াই আছে সোজা-সাপ্টা আলাপ।

বিএনপি-আওয়ামী লীগও বাদ যায়নি আলোচনা থেকে। বইয়ের শেষভাগ ‘শাহবাগ ও চেতনা’ অধ্যায়ে তিনি এক জায়গায় বলেন,

…ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ দুই নৌকায় পা দিয়া শেষতক দুই নৌকা হইতেই লাফাইয়া নামিয়া  পড়ে এবং আসন্ন নির্বাচনে নৌকায় ফিরিয়া যায়। পূর্বের নৌকার অর্থ বলা বাহুল্য নহে, শাহবাগ এবং হেফাজতে ইসলাম। শাহবাগ ও শাপলা চত্বর দুই জায়গা হইতেই লীগ ভোট কুড়াইবার লোভ করিয়াছিল- একদিকে মধ্যবিত্ত পড়ালেখা জানাদের ভোট, অন্যদিকে নিম্নবিত্ত ধর্মভীরুদের ভোট।…

এ আলোচনা থেকে বোঝা যায় শাহবাগের দিকে বিধান তাকিয়েছেন নিরপেক্ষতার চোখ দিয়ে। যাহা সত্য তাহাই বর্ণনায় এসেছে।

বইয়ের শেষভাগে শাহবাগ আন্দোলনের ঘটনাপঞ্জি তুলে ধরেছেন বিধান রিবেরু।

এ বছর (২০১৪) একুশে বইমেলায় বিধান রিবেরু রচিত
‘শাহবাগ :রাজনীতি।ধর্ম। চেতনা’
বইয়ের ভূমিকা লিখে দিয়েছেন সলিমুল্লাহ খান।
ফ্ল্যাপ লিখেছেন কবি সৈকত হাবিব।

এই বইটি শাহবাগ আন্দোলন, আন্দোলনের গতিমুখ, এর প্রেক্ষাপট এবং আন্দোলনের গন্তব্য নিয়ে। আন্দোলন চলাকালে বিভিন্ন ঘটনা ও লেখার জবাব বা বাহাসও রয়েছে বইটিতে। বইটির পরিবেশক পাঠসূত্র।’

বর্তমান সময়ের উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর মধ্যে শাহবাগ অন্যতম আন্দোলন। রাজনীতির সকল হিসেব-নিকাশকে ছাড়িয়ে গিয়ে শাহবাগ এখন অন্যরকম প্রেরণা। এমন বিষয়কে নিজের লেখার বিষয় হিসেবে বেছে নিয়েছেন লেখক। যদিও প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম বই কেনার ক্ষেত্রে গল্প-উপন্যাসকে প্রধান্য দেয়। এ বিষয়ে ইত্তেফাকে ৩ ফেব্রুয়ারি বিধানের প্রকাশিত একটি লেখার লাইনই যথার্থ। তিনি সেখানে এ সংক্রান্ত বিষয়ে বলেন,

‘সবকালেই মানুষ গল্প-উপন্যাস বেশি পড়ে। এই প্রজন্মও তাই। তবে বর্তমানে অনেক তরুণই প্রবন্ধের দিকে মনোযোগী হচ্ছেন। তাদের মেধা ও মনন অনেক শাণিত। তারা অনেক বেশি সিরিয়াস। তবে এদের সংখ্যা বাড়লে আরও ভালো হতো।’

 

  • শাহবাগ রাজনীতি। ধর্ম। চেতনা
  • বইটির প্রকাশক: প্রকৃতি
  • প্রচ্ছদ: তৌহিদ হাসান
  • বইটির পরিবেশক: পাঠসূত্র
  • মূল্য ২০০ টাকা