যাপিত জীবনের অজানা ইতিহাস

নর্দমা থেকে উঠে আসা মাছিটা প্লেটের ভাতের উপর পড়লো। খুবই বিরক্তিকর। এই আকাল সময়ে, অভাবের ভেতর যখন একপ্লেট ভাতের মূল্য অনেক, তখন হারামজাদা মাছি পাশের নর্দমা থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসলো। তার পায়ে নিশ্চয়ই পাশের বাড়ির দারোয়ানের পেশাপ লেগে আছে। পাশের বাড়ির দারোয়ান শেখ মতিন প্রায়ই এ নর্দমায় তার কাজ সারে। হলদে পেশাপের গন্ধে টিকা মুশকিল। তবুও এ নর্দমা ঘেষা টিনের ঘরেই আমাকে বাস করতে হয়।

কংক্রিটের অবহেলার মিথ্যামাখা শহরে নর্দমার পাশে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে যাওয়ার গল্প এ দেশের ইতিহাসে লেখা হবে না। রাষ্ট্র তো যুদ্ধের কথা পুঁথিবদ্ধ করে কিংবা রাজনৈতিক চোরদের কথাও লিখে রাখে। কিন্তু আমার মতো গ্রাম থেকে উঠে আসা গরীব সংসারের ছেলেরা প্রতিনিয়ত নিজের ভাগ্য ফেরাবার চেষ্টায় যে সংগ্রাম, যে যুদ্ধ করে চলে তাদের কথা কোথাও কখনও লেখা হয় না।

হতে পারে, যদি আমি মহান কোনো ব্যক্তিতে পরিণত হই। তখন আমার কষ্টের গল্প মানুষ শুনতে চাবে, পড়তে চাবে। তারপরও এ কষ্ট, এ বঞ্চনা, এ গ্লানিবোধ কেউ কখনও অনুভব করবে না।
time
বলছিলাম, নর্দমার মাছির কথা। মাছিটা আমার ভাতের উপর হেঁটে গেলেও কিছু করার নেই। ভাত আমাকে গিলতে হবেই। পকেটে ভাত কেনার পয়সা নেই। দিন আনি দিন খাই অবস্থায় আছি। এ ঘটনাটা অনেকটা আমার মতই।


এ শহরে আমি নর্দমার মাছির মতই উড়ে এসে জুড়ে বসেছি। তবুও এ শহর আমাকে বের করে দেয়নি। গিলেছে। আমাকে দিনযাপন করার সুযোগও দিয়েছে। এই যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো এক বিদ্যাপিঠে পড়ছি। হাজার হাজার ছেলে-মেয়েদের সঙ্গে মেধার কুস্তাকুস্তি করে ভর্তিও হয়েছি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোথাও যেন হেরে গেছি। যখন ক্যাম্পাসে সবাই আড্ডায় ব্যস্ত, তখন আমি চলে যাই মুনিম মিয়ার সাইবার ক্যাফেতে। সেখানে পাঁচ ঘণ্টার ডিউটি দেই।

সাইবার ক্যাফেতে বসে অবশ্য ভাল অভিজ্ঞতাই হচ্ছে। কম্পিউটার নামক এ যন্ত্রটি কেনার সৌভাগ্য আমার হবে না। তাই সেখানে বসে বসে এ বিস্ময়ের যন্ত্রটিকে নাড়াচাড়ার সুযোগ পাই। আরেক আছে ইন্টারনেট! অবাক কা-! সারা বিশ্ব নিয়ে বসে আছে ইন্টারনেট। এ সুযোগে পরিচয় হয়েছে গুগলের সঙ্গেও। মাসে তিন হাজার টাকা বেতনে দেখা মিলল কম্পিউটারের সঙ্গেও।

তারপর একটা টিউশনি করি। ঢাকার এক নামকরা কলেজের ছাত্রীকে পড়াই। বিনিময়ে মাসে আরও তিন হাজার টাকা। মোট ছয় হাজার টাকায় এ শহরে আমার বেড়ে ওঠা। মাসে বাসা ভাড়া, সিগারেটের খরচ, খাওয়ার খরচ, বই-খাতায় হয়ে যায়। তবে সমস্যা হয় গ্রামে বাবাকে টাকা পাঠাতে গিয়ে। তার মাসে ইনকাম কত জানি না। গ্রামের এক গাছ তলায় বসে চা-বিস্কিট বিক্রি করে। ব্যাটা ভাবে এ শহরে টাকা উড়ে। প্রতি মাসে ১ মিনিট মোবাইলে খরচ করে। আমাকে ফোন দিয়েই বলবে, টাকা পাঠা।

টাকা পাঠাই। তাকে বোঝাই, এ শহরে আমি তোমার চেয়ে ধনী। যে শহরে টাকা উড়ে সে শহর থেকে আমি তোমাকে টাকা ছুড়ে মারি!

২.
সে যাইহোক, ভাতটা তাড়াতাড়ি শেষ করে গত তিনদিন ধরে যে জামাটি পরছি সেটি গায়ে দিলাম। একটা বিদঘুটে গন্ধ আছে শার্টে। একটু কালচেও হয়ে গেছে। রঙ উঠে গেছে। সকাল সকাল ক্লাস ধরতে দেরী করা যাবে না। ক্লাস আমি ফাঁকি দেই না। মনোযোগ দিয়ে ক্লাস করি। ফিজিক্সে পড়াশোনা করছি। মেধাবীরাই এ বিষয়ে পড়ে। আমি অবশ্যই মেধাবী। আগেই বলেছি, হাজার হাজার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মেধার কুস্তিকে বিজয়ী এক যোদ্ধা আমি।

ফিজিক্স অনেক কঠিন বিষয়। আইনস্টাইন না থাকলে এ বিষয়টি এগিয়ে যাওয়া কঠিন ছিল। আইনস্টাইনের জন্যই ফিজিক্সের যত কেরামতি। সে বিষয় বুঝতেই ক্লাস করি। বিত্তশালী শিক্ষার্থী স্যারদের কাছে গোপনে পড়তে যায়। গোপন মানে প্রাইভেট পড়ে। আমার সে খরচ চালানোর সামর্থ্য নেই। এ জন্য ক্লাস করাটা গুরুত্বপূর্ণ।

ক্লাসে চুপচাপ শেষ বেঞ্চে বসি। নিরবে বসি। সাবধানে থাকি যেন আশেপাশে কেউ না আসে। আসলেই শার্ট থেকে ঘামের ভটভটে গন্ধ পাবে। দু’চারজন বোমিও করে দিতে পারে। সে ভয়েই কাছে যাই না। একবার তো ক্লাসে সবচেয়ে ঠোঁটকাটা মেয়ে নোভা আমাকে বলেই বসেছে, এই খচ্চর তুই গোসল করিস না? তোকে দেখলে নোংরা নোংরা টোকাই মনে হয়।

ক্লাসে সেদিন সবাই হো হো করে হেসে উঠেছিল। লজ্জার হলেও সত্যি, ক্লাসের সবাই আমাকে ‘টোকাই মোমেন’ নামে ডাকে। ক্লাসে মোমেন তিন জন। এক মোমেনের ওজন ১০০ কেজি ছাড়িয়ে গেছে হয়তো। তার নাম ‘ভোটকা মোমেন’। আরেকজন কোটি পতির ছেলে। দেখতেও সুদর্শন। তার বন্ধুদের দলও বড়। সবচেয়ে দুষ্টুও বটে। সবাই তাকে পছন্দও করে। লাল রঙের এলিয়ন গাড়ি নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। মেয়ে সমাজে তার অনেক নাম-ডাক। এজন্য তার নাম লুইচ্চা মোমেন।

আর আমি হতভাগা ‘টোকাই মোমেন’। আমাকে দেখলেই নাকি টোকাইদের মতো নোংরা মনে হয়। মাঝে মাঝে লজ্জা পেতাম। শুরুতে তো অপমানে গ্লানিতে এ শহরের প্রতি ঘৃণাও জন্মে গেছে। কিন্তু অবশেষে মেনে নিয়েছি। নিজেকেই বলেছি, টোকাইও একটা সম্মান নিয়ে এ শহরে বেড়ে ওঠে। তাদের নাম আছে। টোকাই। কিন্তু আমার তো এ শহরে কোনো নাম নেই। ভাসমান গ্রাম থেকে উঠে আসা একটা কীট। ঠিক সেই নর্দমার মাছির মতো।

৩.
ক্লাস শেষ করে বের হয়েছি। খিদেও পেয়েছে। এ সময় এক পত্রিকা অফিসে যাই। জনপ্রিয় এক পত্রিকা অফিসের সাহিত্য সম্পাদক আমার প্রিয় বড় ভাই। ইউনিভার্সিটির বড় ভাই। তার সঙ্গে একেকদিন একেক অজুহাতে দেখা করতে যাই। এ সুবাদে এক কাপ চা, দুটি বিস্কুট কপালে জোটে। ভার্সিটি থেকে ২ টাকা বাস ভাঁড়ায় তার সঙ্গে দেখা করি প্রায়ই।

তার সঙ্গে দেখা করলে দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা হয়ে যায়। এক কাপ চা সঙ্গে দুটি বিস্কুট! এর বেশি দরকার নেই। কপাল ভালো থাকলে আসিফ ভাই ভাতও অফার করেন। তখন আনন্দে চোখে জল এসে পড়ে। এ
আকাল সময়ে পেটে ভাত যাবে। এর চেয়ে সৌভাগ্যের আর কি হতে পারে?

আজ অবশ্য আসিফ ভাই মিটিংয়ে। বললেন, তুই আমার ডেস্কে বস। চা খা।
আমিও বসে চা খেলাম। তার অফিসের পিয়ন আমাকে আজ একটি মিষ্টিও দিয়েছে। অনেক বছর পর মিষ্টি খাচ্ছি।
ঘণ্টাখানেক পর আসিফ ভাই এসএমএস করলেন। সেখানে লেখা, চলে যা। আজ মনে হয় না আড্ডা হবে।
উঠে চলে আসলাম। আজ সাইবার ক্যাফেতে ডিউটি নেই। সোজা চলে গেলাম আমার ছাত্রীর বাসায়।

আমার ছাত্রীর গল্প করা হয়নি। অসম্ভব সুন্দরী মেয়ে। আমি সাধারণত সন্ধ্যার সময় তাদের বাসায় যাই। তখন সে ঘুমে থাকে। আমি যাওয়ার পর ড্রয়িং রুমে বসি। সে ঘুম থেকে ওঠে। তারপর হাত মুখ ধুয়ে আমার সামনে আসে।

পৃথিবীর সব নারীকেই মনে হয় ঘুম থেকে উঠলে অসম্ভব সুন্দর লাগে। হয়ত! আমার ছাত্রী রুমানাকে তখন অন্য গ্রহ থেকে উঠে আসা রমণী মনে হয়। চোখগুলো ফোলা, মুখে অন্যরকম গাম্ভীর্য, চোখের পাতায় পানির ফোটা ছলছল করছে, যেন ঘাসের উপর শিশির চিকচিক করছে, কপালের উপর কয়েকটি চুল ভেজা।

কি অপুরূপ সৌন্দর্য। তাকে দেখে আমি অবাক হয়ে যাই। বিস্ময়ে কৌতুহলে আমার পেটে মোচড় দেয়। প্রেম করার বড় সাধ হৃদয়ে জেগে ওঠে। মনে হয়, এ গ্লানির জীবনে তাকে যদি পেতাম তবে পৃথিবীর কাছে কোনো কিছু চাওয়া নিয়ে আর সামনে যেতাম না। রুমানার সঙ্গে পৃথিবীর সব সুখ নিয়ে এক জায়গাতেই থেমে থাকতাম।

অবহেলার শহরে প্রেমেরও আস্পর্ধা লাগে। যাইহোক, আজ বিকালেই রুমানাদের বাড়িতে হাজির হলাম। আজ রুমানা শাড়ি পড়ে আছে। কেন পরেছে জানি না। আমাকে দেখেই চমকে উঠলো। বলল, আরে স্যার! এতো তাড়াতাড়ি! ভাবলাম একটু ছাদে হাঁটাহাঁটি করবো।

আমি একটু বিব্রত হয়ে বললাম, ঠিকাছে যাও। হেঁটে আসো। আমি অপেক্ষা করছি।

রুমানার মা তখন পেছন থেকে হেঁটে আসতে আসতে বলছেন, কিসের ছাদে হাঁটবে। তুমি পড়তে বসাও তো মোমেন। ফাঁকিবাজির যত নমুনা।

আমি হাসতে হাসতে বললাম, থাক খালাম্মা। যেতে দেন। এ বয়সটা তো ছাদে হাঁটার জন্যই। একটু হারিয়ে না গেলে বয়সটার আনন্দ তো উপভোগ করবে কি করে!

আমার কথাগুলো রুমানা খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছিল। তবে সে অনুমতি পেল ছাদে যাওয়ার। আমারও যেতে ইচ্ছে করছিল কিন্তু যাওয়া হলো না। উঠতি বয়সী মেয়েদের মা’রা অনেক সাবধানী হয়। তিনি আমাকে ড্রয়িংরুমে টিভি ছেড়ে দিলেন। আমি টিভি দেখতে থাকলাম। অপেক্ষা করতে থাকলাম আমার রুপসী ছাত্রী রুমানার।

পরিশেষ:
মানুষের জীবনে হরেক রকমের গল্প থাকে। এগুলো মোমেন নামের এক ব্যক্তির জীবনের গল্প। ছোট্ট ছোট্ট প্লটে বিচ্ছিন্ন কত ঘটনা, রটনা। এ গল্পগুলো তো অনেক আগের। জীবনের এ গল্পগুলো ইতিহাসে থাকে না। নর্দমার পাশে মাছির সঙ্গে বাস করা সে ছেলেটি তো এখন অনেক বড়। অন্তত সেই নর্দমার মাছি সে নয়, সে এখন বড় সড় নদীর মাছে রুপান্তরিত হয়েছে। পাশ করে চাকরি পেয়েছে। মাত্র পাঁচ বছরে মাল্টিন্যাশনাল প্রতিষ্ঠানের বড় পদেও বসেছে। অফিস তার ১০ তলায়।

আগে সে টিনের চালের ফুটো দিয়ে উপরে আকাশ দেখতো। কিংবা ইটের দালানের শ্যাওলা চোখে পড়তো। কিন্তু এখন সে ১০ তলা থেকে নিচে তাকায়। আর দেখে ছোটছোট কীট-পতঙ্গ। নর্দমার মাছিও ১০ তলা থেকে এখন আর দেখা যায় না। কিংবা মাছিরও সামর্থ্য নেই ১০ তলায় উঠে আসার।

শরীরে তার সুগন্ধী! চকচকে শার্ট-প্যান্ট-জুতা। তার দিকে এখন মানুষ তাকায়। অথচ কত বছর আগে সে তো শুধু মানুষকেই দেখেছে। মানুষের সুখ দেখেছে। তার জীবনের এ গল্প তো ইতিহাসে নেই। আছে তার হৃদয়ে। গোপন কোনো জায়গায়। যে জায়গায় এখনও রয়ে গেছে রুমানা।

বাস্তবতার কঠিন পাটাতনে কখন যে সে রুমানের প্রেমে পিষ্ট হয়ে গেছে এ খবর সে নিজেও জানে না। রুমানাকে পড়াতে গিয়ে তার রূপের দাপটে ঘায়েল হয়ে সে তো এখন হারানো গল্পের মতই। রুমানাকে সে কখনও বলেনি ‘ভালোবাসি’। রুমানাই একবার তাকে প্রশ্ন করে বসে, স্যার আপনি কি আমাকে ভালোবাসেন?

প্রেমের তীব্র আবেগকে সামাল দিয়ে কথাটা শুনেও না শোনার ভান করে। কিন্তু রুমানা তাকে আবার প্রশ্ন করে, স্যার আপনি কি আমাকে ভালোবাসেন?
সেদিন চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় মোমেন। টোকাই মোমেনের এতো বড় সাহস ছিল না। তার সাহস নেই সেই সু-উচ্চ দালানের ভেতর সুন্দরী রুমানার কাছে প্রেমের শিকার হওয়ার। তার বাস্তব জীবনে রুমানা বড্ড বেমানান।

রুমানা শহরের কংক্রিটের চাকচিক্য দেখে অভ্যস্থ। কিন্তু নিচু তলার নর্দমার সঙ্গে তার পরিচয় নেই। রুমানা মোমেনকে ভালোবাসে কিনা সে-টা মোমেন জানতো না। কিন্তু রুমানা শুধু মোমেনের কাছে ভালোবাসার কথা জানতে চেয়েছিল। সে অধিকার রুমানার নেই। কেন সে জানতে চাবে? সেদিন রুমানাদের ঘর থেকে বের হয়ে আর কখনও সে ফিরে যায়নি। রুমানাও কখনও ফোন করে মোমেনকে খোজেনি।
কিন্তু আজ এতো বছর পর রুমানাকে খুঁজে ফিরে মোমেন। এ চাকচিক্যের শহরে মোমেন সেদিনের প্রশ্নের উত্তর দিতে চায় রুমানাকে।

দশ তলার কাঁচের বিল্ডিং থেকে নিচে তাকায় মোমেন। দেখে শহর জুড়ে মাছিরা কিলবিল করছে। প্রতিনিয়ত তারা ছুটে চলছে। ছুটে চলার ভেতর কত গল্প, কত বেদনা রয়ে যায় কিংবা হারিয়ে যায়। কত প্রশ্নের উত্তর মনের ভেতর রেখে তারা একদিন এ পৃথিবী ছেড়েও চলে যায়। কিন্তু পৃথিবীর ইতিহাসে লেখা হয় না সেসব ব্যর্থ প্রেমের গল্প কিংবা কোনো প্রেমের প্রশ্নের উত্তর। যেমন মোমেন দেয়নি রুমানার প্রশ্নের উত্তর। যে উত্তরটি রুমানার ইতিহাসে এখনও অজানা…