ইন্টারনেট জনসংযোগ

Social-media-revolution1বাংলাদেশ টেলিকম নিয়ন্ত্রক সংস্থা (বিটিআরসি) প্রকাশিত নতুন তালিকায় দেখা গেছে ২০১৩ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত দেশে মোবাইল ফোনের মোট গ্রাহক সংখ্যা ১০ কোটি ৫০ লাখ ৫১ হাজার এবং ইন্টারনেট গ্রাহক সংখ্যা ৩ কোটি ৫৬ লাখ ৩১ হাজার ২৬৯ জন। চলতি বছরের প্রথমার্ধে নতুন মোবাইল গ্রাহক হয়েছেন প্রায় ৮০ লাখ। এখানে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে বলেই লক্ষ্য করা যায়।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে তথ্য প্রযুক্তিখাতে ইন্টারনেট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে যাচ্ছে সেটিও স্পষ্ট হয়ে উঠলো প্রাপ্ত তথ্য থেকে। ইন্টারনেট গ্রাহক সংখ্যা যত বাড়বে ততই নিত্য সমস্যাগুলোর প্রতি তীব্রভাবেই নজর পড়বে সাধারণ জনগণের। সবাই এমনটাই আশা করছেন। এর কারণও আছে। বর্তমান সময়ে যে কোনো রাজনৈতিক কিংবা অরাজনৈতিক বিষয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় সকলের সরব উপস্থিতি সে কথারই জানান দিচ্ছে।

বাংলাদেশে ফেসবুক জনপ্রিয়তা পাওয়ার আগেই সোশ্যাল মিডিয়া বা নিউ মিডিয়া হিসেবে বাংলা ব্লগগুলো জায়গা করে নিয়েছে। যদিও বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেটের মাধ্যমে জনসংযোগ বিষয়টি নব্বয়ের দশক থেকেই ধীরে ধীরে শুরু হয়েছে। কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে বিংশ শতাব্দির শুরু থেকে বিশ্বব্যাপী জনসংযোগ তৈরি হতে থাকে।

ইন্টারনেট ব্যবহার করে মানুষ তাদের নিজস্ব সমস্যা এবং সমস্যার সমাধানের দিকেও নজর দেওয়া শুরু করেছিল। তবে ২০০৫ সালে সামহোয়্যার ইন ব্লগের হাত ধরে বাংলাদেশ প্রবেশ করে বাংলাভাষার ভার্চুয়াল জগতে। এ জগৎ ব্যবহার করে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা তাদের গণতন্ত্র চর্চা শুরু করেন বলেও অনেকে দাবি করেন।

হ্যাবারমাস এবং জনপরিসর:

সোশ্যাল মিডিয়া বা সামাজিক মাধ্যমকে পাবলিক স্ফেয়ার বা জনপরিসরও বলা যায়। জার্মান দার্শনিক জুর্গেন হ্যাবারমাস প্রথম জনপরিসরের ধারণাটি দেন। জনপরিসরকে হ্যাবারমাস বলেছেন রাষ্ট্র এবং সমাজের মাঝামাঝি জায়গা। যেখানে রাষ্ট্রের সকল পর্যায়ের জনগণ মুক্তভাবে তাদের মত প্রকাশ করতে পারবে। এমনকি যে কোনো সমস্যা নিয়ে তীব্রভাবে আলোচনাতে অংশ নিতে পারবেন। তবে শেষ পর্যন্ত আলোচনার মাধ্যমে একটি রাজনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণেও তারা প্রভাবিত হবেন।

হ্যাবারমাস এ তত্ত্বটি দিয়েছিলেন ১৯৬৪ সালে। তখন তিনি ভেবেছিলেন এ জনপরিসরগুলোকে সহায়তা করবে মিডিয়া। জনগণের নানান সমস্যা নিয়ে মিডিয়ায় আলোচনা সমালোচনার মাধ্যমে জনগণ সরাসরি তাদের মতামত দিয়ে একটি রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানে এগিয়ে যাবেন।

এটি হ্যাবারমাসের স্বপ্ন ছিল। তবে ট্রেডিশনাল বা মূলধারার মিডিয়া এ কাজটি তেমন পোক্তভাবে করতে পারেনি। তারা সম্পূর্ণভাবে যে ব্যর্থ হয়েছে তাও নয়। তবে প্রিন্ট মিডিয়ায় জনগণের নিজস্ব মতামতের তেমন জায়গাও নেই। সেখানে ব্যক্তি বিশেষের গুরুত্বই সবচেয়ে বেশি। তার উপর সেন্সরশিপ একটি বড় ইস্যু। যখন মূলধারার মিডিয়াগুলো জনসংযোগ করতে গিয়েও নানান ধরনের বাধার সৃষ্টি হচ্ছে ঠিক তখনই “নিউ মিডিয়া” সব বাধা ডিঙিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে।

বর্তমান সময়ে অনলাইনে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় মানুষ এক জায়গায় মিথোস্ক্রিয়া করছে, আলোচনা করছে এবং সমাধানের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করছে। এর মাধ্যমে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যাপারে চাপ তৈরি করারও চেষ্টা করা হচ্ছে।

অনলাইন সংবাদমাধ্যম এবং জনপরিসর:

সোশ্যাল মিডিয়া এবং অনলাইন সংবাদমাধ্যমের মধ্যে অবশ্যই বিস্তর ফারাক আছে। সংবাদমাধ্যমে একটি লেখাকে বার্তা সম্পাদকের হাত ধরেই প্রকাশ হতে হয়। যেখানে সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখক চাইলেই নিজের ইচ্ছেমত (লেখার মান যেমনই হোক না কেন) তার লেখা প্রকাশ করে ফেলছে।

তবে অনলাইন সংবাদমাধ্যম জনপরিসর বা জনমতে গুরুত্ব দেওয়ার জন্য নানান পন্থাও অবলম্বন করছে। এক্ষেত্রে অনেক সংবাদমাধ্যমের ফেসবুকে সরব উপস্থিতির উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। প্রতিটি সংবাদমাধ্যম নিজস্ব ফেসবুক ফ্যান পেইজ চালু করেছে।  যেখানে পেইজগুলোতে প্রতি ঘণ্টায় কিংবা তারও কম সময়ে গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করা হয়। এখানে পাঠকের গুরুত্ব থাকে সবচেয়ে বেশি। পাঠকরা সরাসরি ফেসবুক পেইজে তাদের মতামত জানাতে পারছেন।

সংবাদমাধ্যম কখনও মনগড়া সংবাদ পরিবেশনের দায়িত্ব পালন করে না। সংবাদমাধ্যমের কাজই সঠিক তথ্য সরবরাহ করা। পাঠকের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া। মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলো সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে সে চেষ্টাই শুরু করেছেন।

সোশ্যাল মিডিয়া এবং সাংবাদিকতা নিয়ে একবার এক সাক্ষাৎকারে আয়ারল্যান্ড ভিত্তিক অনলাইন মাধ্যম স্টোরিফুল ডট কমের নিউজ এডিটর গধষধপযু ইৎড়হিব বলেন, স্মার্ট সংবাদমাধ্যমগুলো এখন সোশ্যাল মিডিয়াতেও নিজেদের বিচরণক্ষেত্র বানিয়ে নিয়েছে। বর্তমান সময়ে এটি খুবই জরুরী। সোশ্যাল মিডিয়ায় তারা পাঠকের কণ্ঠস্বর শুনতে পান। এটি অনেকটা স্পাইডার ম্যানের মতো। স্পাইডার ম্যান যেমন সবার সমস্যার কথা শুনতে পান ঠিক তেমন।

সাংবাদিকদের সম্পর্কে তিনি আরও বলেন, প্রতিটি সাংবাদিকদের উচিত সোশ্যাল মিডিয়া নিয়মিত ব্যবহার করা এবং নিজের তৈরি করা রিপোর্টটি সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করা। এতে করে পাঠকের সঙ্গে একটি সম্পর্ক তৈরি হবে। ভালো-খারাপ সব সমালোচনা সাংবাদিকরা নিতে শিখবে। তাদের ভবিষ্যতে ভালো রিপোর্ট তৈরিতে এ সমালোচনা কাজে দিবে। শুধু তাই নয়, সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে তাদের নতুন সোর্সও তৈরি হবে। কারণ সোর্স ছাড়া একজন সাংবাদিক অন্ধ পথিক ছাড়া আর কিছুই নয়।

গড়ে উঠছে সিটিজেন জার্নালিজম:

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ব্লগ এবং ফেসবুক জনপ্রিয়। এই দুই মাধ্যম ব্যবহার করে তৈরি হচ্ছে নাগরিক সাংবাদিকতা। প্রত্যেকেই নিজের মতামত, বিশ্লেষণ, আলোচনা সমালোচনার জায়গায় তৈরি করে নিয়েছে। ফেসবুক স্ট্যাটাসে রাজনীতি নিয়ে কথা বলছেন। রাজনীতিবিদদের বিভিন্ন কাজের সমালোচনাও করছেন। এতে করে ধীরে ধীরে সচেতনারও সৃষ্টি হচ্ছে। বলা হয়, ভবিষ্যৎ সংবাদিকতা হবে সিটিজেন বা নাগরিক সাংবাদিকতা।

ইন্টারনেট বদলে দেবে সমাজ:

ইন্টারনেট ব্যবহার করে অনলাইন বিশ্বের কাছে নতুন এক জগৎ সৃষ্টি হয়েছে। যে জগতে প্রতিটি ভার্চুয়াল চরিত্র নিজের মতো করে স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারছেন। মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে। যে সম্পর্ক অনেক সময়ই অফলাইনেও গড়ায়। শাহবাগ আন্দোলন তার একটি অন্যতম উদাহরণ হিসেবে বলা যায়। দীর্ঘ সময় ধরে ব্লগিং জগতে যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তির দাবি নিয়ে আন্দোলন করছিলেন ব্লগাররা। ফেসবুকেও এর বিস্তার দিন দিন বেড়েই চলছিল। পুরো আন্দোলনটিই ছিল অনলাইন নির্ভর। কিন্তু ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি সে আন্দোলনটিই গড়ালো অফলাইনে। সরাসরি রাস্তায় নেমে পড়লেন ব্লগাররা। তাদের সঙ্গে একাত্ব হলেন দেশের আপামর জনতা।

শুরুতেই হ্যাবারমাসের কথা উল্লেখ করেছিলাম। হ্যাবারমাস তার বক্তব্যে বলেছিলেন, মানুষ তাদের আড্ডায় আলোচনার মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট মতামতে সকলেই পৌঁছাবেন। সে মতামত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে রাষ্ট্রকে চাপ দিবে। সে আড্ডা হতে পারে চায়ের দোকানে কিংবা কোনো রেস্টুরেন্টে। ১৯৬৪ সালে বিস্তার পাওয়া জনপ্রিয় এ তত্ত্বটির সময় ইন্টারনেট ছিল না। এজন্যই বর্তমান সময়ে হ্যাবারমাসের বক্তব্য ইন্টারনেট জগতের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া যায়। সুতরাং তাত্ত্বিক এবং ব্যবহারিক উভয়ভাবেও ইন্টারনেটকে এখন জনসংযোগ ঘটনোর অন্যতম হাতিয়ার হিসেবেও উল্লেখ করা যায়। যদিও বিস্তরভাবে হ্যাবারমাসের এ তত্ত্ব নিয়ে বহু গবেষক সমালোচনা করেছেন, এখনও করছেন।

বর্তমান সময়ে ঘটনাগুলোর দিকে নজর দিলেই দেখা যায় ইন্টারনেট সমাজিক আন্দোলনের অন্যতম হাতিয়ার। জনসংযোগ এবং জনপরিসরে এর ভূমিকা ধীরে ধীরে বেড়েই চলেছে। ধারণা করা হচ্ছে, আসছে জাতীয় নির্বাচনে বাংলাদেশে সোশ্যাল মিডিয়া সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখবে। ইতিমধ্যেই অনেক রাজনীতিবিদ নিজেদের ফেসবুক ফ্যান পেইজে নিজেদের প্রচারণাও শুরু করেছেন। নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরারও চেষ্টা করছেন সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে। এসব বিষয়গুলোকে ইতিবাচক হিসেবেই ধরে নেওয়া যায়।