গল্প: অনির্দিষ্ট যাত্রা

ড্রাইভার বাসের ইঞ্জিনে স্টার্ট দিল। ঠিক তখনই পান্নু ভাইয়ের গাড়ি বগুড়ার ঠনঠনিয়ার বাস স্ট্যান্ডে থামলো। পান্নু ভাই বলল, জাহিদ দৌড় দাও। গাড়ি ছেড়ে দিবে। আমি হ্যাঁ সূচক মাথা নেড়েই বাসে লাফ দিয়ে উঠে পড়লাম। তখনই ড্রাইভার বাস টানা শুরু করলো। উঠে দেখি, ওমা! পেছনে যাওয়ার কোনো জায়গাই তো নেই। ঈদ শেষে মানুষজন ঘরে ফিরছে। সঙ্গে ডাব, নারিকেলের বস্তা। দুপাশের সিটে নিজেরা বসে মাঝখানের হাঁটার একমাত্র জায়গাটা বস্তায় ভরে গেছে। ভাবলাম, এখন বাংলা সিনেমার হিরোদের মত লাফ দেওয়া ছাড়া পেছনে পৌঁছানোর উপায় নেই। ওদিকে ফোনটাও ভাইব্রেট করছে। আমি জানি পান্নু ভাই ফোন দিচ্ছে। তারপরও ফোন না ধরেই দিলাম লাফ। এদিক সেদিক না তাকিয়েই লাফিয়ে লাফিয়ে বাসের শেষ সিটে গিয়ে পৌঁছালাম। শেষ সিটটা ছাড়া এই মুহূর্তে উপায় ছিল না।

jatraঈদের পরে ছুটি শেষে সারা বাংলাদেশ থেকে বহু মানুষ ঢাকায় ফিরবে। মানে হলো, ঢাকায় যারা আমার মতো কাজ করে খায় দায় তাদের ঢাকা তো ফিরতেই হবে। সেজন্য বাসের টিকিট পাওয়া অনেকটা ঈদের চাঁদ হাতে পাওয়ার মতই। তারপরও গত দুইদিন পান্নু ভাই তার দলবল লাগিয়ে রেখেছিল অন্তত একটা টিকিট যাতে ম্যানেজ হয়। আজই ভোরবেলা কাউন্টার থেকে ফোন দিয়ে বলল, ভাই একটা টিকিট হবে, তবে লাস্টের সিট।

পান্নু ভাই সঙ্গে সঙ্গে বলল, ভাই ছাদের সিট হইলেও চলবে। আমার লোকরে ঢাকা পর্যন্ত পৌঁছাতেই হবে।

যাই হোক, আমি শেষ সিটে বসেই ফোনটা বের করে পান্নু ভাইকে কল দিয়ে ধন্যবাদ জানালাম। বেচারা সারাজীবন আমাদের জন্য কষ্ট করেই গেল। বগুড়া আমার বন্ধুর বাড়ি। তবে বন্ধুর চেয়ে পান্নু ভাইয়েরই চিন্তা বেশি। আমাদের আতিথেয়তায় যাতে কোনো কমতি না হয় সে বিষয়ে পান্নু ভাই সব সময় তৎপর থাকেন। আমি বিগত দশ বছর যাবৎ বগুড়ায় বছরে একবার হলেও আসি। কিন্তু কোনোবারই আমার বন্ধু শামীমের বাসায় থাকা হয়নি। বগুড়া এলেই শামীম আমার ব্যাগপত্র নিয়ে পান্নু ভাইয়ের বাসায় দিয়ে আসবে। এরপর আমাকে নিয়ে ঘুরে ঘুরে বেড়াবে। কখনও আমরা বগুড়া শহর রিক্সা দিয়ে ঘুরি। কখনও গাড়ি দিয়ে।

খুব ছিমছাম শহর বগুড়া। আমার আবার এ শহরটা খুব নরম সরম মনে হয়। ঢাকাকে যেমন মনে হয় মজবুত। একটা মেশিন যেমন মজবুত দেখায় ঠিক তেমনই। সারাক্ষণ হৈ চৈ। কোলাহল। যানজট। এখানে সেখানে গালাগালি, মারামারি। বগুড়া মোটেও তেমন শহর নয়। তাই বগুড়া নরম মনে হয়। খুব নিরবতার মধ্যে দিয়ে বগুড়া মানচিত্রে দাঁড়িয়ে আছে। আপনারা হয়ত বলবেন, ঢাকার বাইরে সব শহরই এমন। কিন্তু আমি বলবো ভিন্ন কথা। বগুড়া অত্যন্ত আধুনিক শহর। ঢাকার মতই। যদিও ঢাকার মতো চাকচিক্যের খুব একটা আভাস এখনও লাগেনি। তারপরও আধুনিক শহরে যেসকল সুযোগ সুবিধার কথা আমরা বলি। অন্তত ঢাকার মত একশভাগ না হলেও কাছাকাছি পর্যন্ত যাবে বগুড়া। তো, এই শহরে এলেই আমার মনটা ভালো হয়ে যায়। খালি রাস্তায় ঘুরে ঘুরে শহরটা দেখা যায়। সুন্দরী মেয়েদের মার্কেট কিংবা ফাস্টফুডের দোকানেও দেখা যায়। সৌন্দর্যের দিক থেকে তারা কোনোভাবেই ঢাকার মেয়েদের থেকে পিছিয়ে নেই। অনেকে বলবে, তাদের ভাষাটা কিঞ্চিত হলেও সৌন্দর্যটাকে ঢেকে দেয়। ঢাকার মেয়েদের মতো স্পষ্ট শুদ্ধ উচ্চারণে তারা কথা বলতে হয়ত জানে না। ঢাকার অনেক মেয়ে অবশ্য বগুড়ার মেয়েদের আনস্মার্টও বলতে পারে। এ বিষয়ে আমার ব্যক্তিগত মতামত হলো, তারা যে শহরে বেড়ে উঠেছে সেই শহরের ভাষায় কথা বলাটা মোটেও আনস্মার্ট হওয়া নয়। এটাই তো ওদের কালচার। সেটা যদি তারা শুদ্ধভাবে ধারণ করে এগিয়ে যেতে পারে তাহলে দোষের কিছু নেই।

তো, আমি বলছিলাম পান্নু ভাইয়ের কথা। পান্নু ভাই সহজ সরল মনের একজন মানুষ। কখনও এক ফোটাও বিরক্তি কিংবা রাগের ছাপ গত দশ বছরেও আমি এই লোকটির মধ্যে দেখিনি। বরাবরই চুপচাপ ঠাণ্ডা মেজাজের পান্নু ভাই নিজের বাসায় আমাকে থাকতে দেন। সময় মতো মজাদার খাবার এবং বগুড়ার ঐতিহ্যবাহী সব মিষ্টিও আমার সামনে হাজির করেন। গভীর রাতে গাড়িতে করে আমাকে বগুড়া শহরটা ঘুরান। আর বিভিন্ন এলাকার বৈশিষ্ট সম্পর্কে বলেন। কোন এলাকায় ছিনতাই হয়, কোন এলাকায় ব্যবসা হয়, কোন এলাকায় ছোটবেলায় তারা আড্ডা দিয়ে কাটিয়ে দিয়েছেন। এই সব গল্প হয়। কখনও কখনও দেশের রাজনীতি নিয়েও আলাপ হয়। পান্নু ভাই ব্যবসা করেন। সেই ব্যবসারও বর্তমান অবস্থা নিয়ে আমার সঙ্গে আড্ডা হয়। যেমন, তাদের চিনি ডালডার পাইকারি ব্যবসা। ট্রাকে করে যখন মাল ঢাকা থেকে বগুড়া আসে তখন কিভাবে নির্ঘুম রাত কাটাতে হয়। ছিনতাই কিংবা চুরি হলে কীভাবে সেই অবস্থাগুলোকে সামাল দেন এইসব বিষয়ে কথা বলেন। পান্নু ভাই বয়সে আমার বড়। তাও শামীমের ছোট্টবেলার বন্ধু। শামীম আবার আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বন্ধু। সেই সূত্রেই পান্নু ভাই আমাদের কাছের লোক। পান্নু ভাই এসএসসি এবং এইচএসসিতে স্ট্যান্ড করা ছেলে। মেধাবী ছাত্র হয়েও স্বাধীন ব্যবসা তিনি এনজয় করেন। জীবনে স্বাধীনতাটাই বড়। পরাধীন জীবন কষ্টের, বেদনার, চিন্তার। যদিও জীবনটা দুঃখময়। সুখের সন্ধানে যাত্রার নামই জীবন। এত দুঃখের মধ্যে যদি একবিন্দু স্বাধীনতা না থাকে তাহলে সে জীবন পার করাটাও কঠিন হয়ে পড়বে।

এ বছর অবশ্য বগুড়ায় ঈদের পরপর আসতে হয়েছে। শামীমের ছোট ভাইয়ের বিয়ে। সেই বিয়ের সবগুলো অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকা সম্ভব না। তাই শুধু গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে বন্ধুর অভিমান কমানোর একটা বৃথা চেষ্টা করলাম। শুক্রবার বাসে উঠে আমাকে ঢাকা পৌঁছাতেই হবে। কারণ শনিবার অফিস ধরতে হবে। ওইদিকে বিয়ে, বৌ-ভাত ধরতে গেলে আমাকে রবিবার পর্যন্ত বগুড়া থেকে যেতে হয়। সেটা তো সম্ভব না। তাই যত দ্রুত সম্ভব পালানোর ব্যবস্থা করা। এ বিষয়টি শামীম বুঝতে না চাইলেও পান্নু ভাই বুঝেছেন। তাই ঢাকায় যাওয়ার টিকিটের ব্যবস্থা করার জন্য তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করে গেছেন। সফলও হয়েছেন। তার সফলতার কারণেই এখন আমি হানিফ এন্টারপ্রাইজ বাসের সবশেষের সিট জে থ্রিতে বসে আছি।

শেষের সিটে বসার বিড়ম্বনা অনেক। সারাক্ষণ লাফায়। রাস্তা স্পিডব্রেকার থাকলে তো কথাই নেই। তখন এমন অটো লাফ হয়ে যায় যে, মনে হয় এখনই বাসের ছাদ ভেঙে উপরে আপনাতেই উড়ে যাবো। এসব কিছু আমার কাছে তুচ্ছ। কারণ টিকিট পেয়েছি। ঢাকায় ফিরতে পারছি। এও বা কম কি। তবে এই লাফানির পর্বটা আমাকে ছোট্টবেলার একটা স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। আমার ছোটবেলাটা কেটেছে সরকারি কলোনীতে। সেই কলোনীতে আমাদের বাসার পাশেই ছিল বিশাল এক মাঠ। সে মাঠে একদিন এক লোক বিশাল সাইজের এক ঘোড়া নিয়ে হাজির। একদম অরিজিনাল ঘোড়া! আমি তো দেখে অবাক। অবাক বিষ্ময়ে ঘোড়ার লেজ নাড়ানো দেখি। দৌড় দেখি। আগে কখনও সামনাসামনি ঘোড়া দেখিনি। এই প্রথম ঘোড়া দেখে আমি তো ভয়ে শেষ। কি তেজী, তীব্রতা ঘোড়ার ভেতর। মানুষকে তো এমনই ঘোড়ার মতো তীব্র বেগে দৌড়াতে হয়। নাহলে জীবনের প্রতিযোগিতায় হেরে যেতে হয়। যাই হোক, সেই ঘোড়ার পেছনে কলোনীর সব ছেলেপেলে দৌড়ায়। ঘোড়ার উপর সওয়ার হওয়া লোকটা সবাইকে ভয়ও দেখায়। উপর থেকে বলে, ওই হারামজাদারা সরে দাঁড়া নাইলে ঘোড়ার পায়ের তলায় পড়বি।

যখন কেউ তার কথা শুনে না। তখন সে রশিটা ধরে দেয় টান। আর ঘোড়া তার সামনের দু’পা উচিয়ে দেয় এক লাফ। এই দেখে ঘোড়া থেকে দূরে দৌড় দেওয়া শুরু করে বাচ্চা ছেলেরা। আমি এসবের কাছেধারে নেই। আমি দূর থেকে দেখেই আনন্দ পাই। কাছে যাওয়ার মত সাহস আমার হয়নি। কিন্তু হঠাৎ করে আমার একটু দূরে ঘোড়াটি নিয়ে এলো ঘোড়া চালক। সে আমাকে দূর থেকেই বলছে, এই তুই কি ভয় পাস?

আমি মাথা নেড়ে ইশারাতেই হ্যাঁ বললাম।

সে তখন বলল, মজার জিনিসে ভয় কিসের? আয়, উপরে আয়। তোর ভয় নামায়া দেই।

আমার তখন বুক ফেটে কান্না পাচ্ছিল। এতোই ভয় পাই যে আমি পেছনে ছুটে দৌড়ও দিতে পারছিলাম না। দেখি ঘোড়া খটাখট খটাখট করে আমার সামনে এলো। তারপর লোকটি লাফ দিয়ে ঘোড়া থেকে নেমে আমাকে উপরে উঠিয়ে সেও উঠলো। আরে! সে কি অনুভূতি। ভয়, শংকা, আনন্দ, বিস্ময় সব একাকার হয়ে যাচ্ছিল। ঘোড়া যখন দৌড় দিল তখন আমি চিৎকার করে বলছিল, টিপু সুলতানের ঘোড়া (তখন বিটিভিতে ‘দ্য সোর্ড অব টিপু সুলতান’ নামে জনপ্রিয় এক টিভি সিরিয়াল হতো)। তোরা সরে যা। সরে যা। এইভাবে দু চক্কর দেওয়ার পর সে আমাকে ঘোড়া থেকে নামিয়ে দেওয়ার আগে বলে, দে দুই টাকা দে। প্রতি চক্কর এক টাকা।

আমি তখন মিনমিনিয়ে বললাম, আমার কাছে যে টাকা নেই।

লোকটি অদ্ভুতভাবে ময়লা দাঁত বের করে হাসতে হাসতে বলে, বলে কি হারামজাদা। টিপু সুলতানের কাছে ট্যাকা নাই।

এই বলেই সে আমাকে নামিয়ে দেয়। নামার পর কোমরে তীব্র ব্যথা অনুভব করি। তার কারণ হলো ঘোড়া যখন লাফিয়ে লাফিলে চলছিল তখন ঘোড়া যত না লাফিয়েছে তার চেয়ে বেশি আমি লাফিয়েছি। তাই আজ বাসের শেষ সিটের ঝাঁকির সঙ্গে আমার সেই লাফানোর স্মৃতিটি মনে পড়ে যাচ্ছে। বাস যত না লাফায় আমি তার চেয়ে বেশি লাফাই।

সাধারণত যে কোনো যাত্রাতেই আমি বাসের লোকজনকে বোঝার চেষ্টা করি। বাসের একজন মানুষের জীবনটা কেমন? মানুষ কি করে? কেউ ঘুমায়, কেউ বাচ্চাকে সামাল দেয়, কেউ পাশের জনের কাঁধে মাথা রেখে কাঁচের ওপাশে চলে যাওয়া ধান ক্ষেত, পুকুর, গাছগাছালি দেখতে থাকে, কেউ কেউ চুপচাপ গালে হাত দিয়ে বসে থাকে। বসে থেকে কি যে ভাবে তারা! প্রতিটি মানুষ মাঝেমাঝে খুব গভীর ভাবনায় নিজেকে নিয়ে যায়। সে ভাবনার খবর একমাত্র সে নিজেই জানে।

তবে আজকে আমার অভিজ্ঞতাটা একটু ভিন্ন। আমি কখনও এমন পেছনের সিটে বসিনি। যেখান থেকে সামনের সব মানুষের মাথা দেখা যাবে। বাস ভরা মানুষ অথচ আমাকে দেখতে হবে সবার মাথা। এটা একটা কথা হলো? আবার আমার পাশের লোকটা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। অনেকক্ষণ ধরেই দেখছি তার কান্না। অনেকটা বাধ্য হয়েই প্রশ্ন করলাম, ভাই কোনো সমস্যা? কাঁদছেন কেন? সে তখন বলল, ভাই বাসে উঠে তো অনেকদূর চলে এলাম। বগুড়া ছাড়িয়ে সিরাজগঞ্জ পার হয়ে যাচ্ছি। এই মুহূর্তে ফোনে শুনলাম আমার ছোট মামা মারা গেছেন। আমি এখন কেমনে ফেরত যাই? ফেরত গেলে কেমনে আবার ঢাকায় যামু? ঢাকায় না যাইতে পারলে ছোট্ট চাকরিটাও তো ভাই যাইবো গা।

আমি লোকটির অবস্থা শুনে আঁতকে উঠি। বেচারা কি একটা পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছে। সে আবার কাঁদতে কাঁদতে বলছে, ভাই, আমার এই মামা ছোটবেলায় আমারে সাঁতার শিখাইছে। মামা আমাকে মাছ ধরা শিখাইছে। একলগে কত মাছ মামু ভাইগনা মিল্যা ধরছি! আমার সাতটা মামু। কিন্তু কারো লগে আমার খাতির নাই। আমার এই মামা আমার চেয়ে চাইর বছরের বড়। তাই তার লগে আমার ভাব ছিল। এখন কন দেখি কি করি। কেমনে ফেরত যাই? ফেরত গেলে আসুম কেমনে?

আমি শান্তনার ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। কি বলবো? কিংবা কি বলা উচিত? আমি জানি না। তবে তার মাথায় আমার হাত বুলিয়ে দিতে ইচ্ছে হচ্ছিল। তার জন্য অদ্ভুত রকমের একটা মমতা তৈরি হচ্ছিল। তার অঝোর কান্না এ বাসের কেউ দেখতে পাচ্ছে না। কেউ হয়তো শুনছে কিন্তু কেউ পেছন ফিরে দেখছে না। পেছনে ফিরে দেখার অভ্যাস মানুষ এখন ভুলে যেতে চায়। এটা বদ অভ্যাস। পেছনে শুধু কষ্ট থাকে। বেদনা থাকে। কেউ বেদনা নিয়ে বেঁচে থাকতে চায় না। একমাত্র পাশের লোকজনই বেদনা অনুভব করে। আমি তো লোকটির পাশে বসে আছি। তাই অনুভব করছি। তার জন্য তৈরি হওয়া সাগর পরিমাণ মমতা তৈরি হলেও আমার কিছু করার নেই তার জন্য। তার মাথায় হাতও বুলিয়ে দিতে পারছি না। লজ্জা লাগছে। শহুরে যান্ত্রিকতায় বেড়ে উঠেছি বলে, অন্যের দুঃখে শান্ত্বনার ভাষা আমার জানা নেই। আমরা নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকতে পছন্দ করি। কারও পাশে দাঁড়াতে গেলে কোনো বিপদে পড়ার ভয় থাকে; তাই কারও পাশে দাঁড়ানো থেকেও বিরত থাকি। তারপরও কখনও কখনও এই সমস্ত স্বার্থপরতার দেয়াল মানুষের ভেঙে দিতে ইচ্ছে হয়। আমার এখন এই দেয়াল ভেঙে চুরমার করে দিতে ইচ্ছে হচ্ছে। দেয়ালকে ভেঙে লোকটিকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে হচ্ছে। তারপরও যান্ত্রিকতায় দেয়াল ভাঙা যায় না। তাই চোখ বন্ধ করে ঘুমের ভান করে পড়ে রইলাম। মিথ্যের আশ্রয় নিলাম। সেটাই সত্যি হয়ে গেল। আমি ঘুমিয়ে গেলাম।

চারপাশে হাজারো মানুষ। কেউ কাউকে চিনি না। অচেনা অজানা জায়গায় যাওয়ার অভ্যাস আমার আছে। কিন্তু এ জায়গাটা কেন যেন পুরাই অচেনা। মানুষগুলোও কেমন যেন। প্রত্যেকের চোখ মুখ লাল। যেন অনন্তকাল এরা ঘুমায়নি। তারা সবাই গোলক পাকিয়ে কি নিয়ে যেন আলোচনা করছে। আমিও সেই গোলকের ভেতর ঢুকতেই প্রচন্ড কোলাহলে পড়ে গেলাম। কিছুই বুঝতে পারছি না। চেঁচামেচি শুরু। কারও কথা বুঝে উঠতে পারছি না। লাফ দিয়ে বের হতেই বাসের সিট থেকে উঠে বসলাম। এই কিছুক্ষণের মধ্যে গভীর স্বপ্নেও ঢুকে গেছি। কি অবস্থা! তবে চেঁচামেচি হচ্ছে। বাসের লোকজন সবাই চিৎকার করছে। হুট করে ঘুম থেকে উঠে কিছু বুঝে উঠতে পারছিলাম না। আস্তে আস্তে বিষয়টি বোঝার জন্য অপরিষ্কার আঙুল দিয়ে চোখ দুটো কচলানো শুরু করলাম। বাইরে তাকিয়ে দেখি হাইওয়ে রেস্ট্রুরেন্টের সামনে বাসটি দাঁড়িয়ে। বুঝলাম বিরতি হয়েছে। চিল্লাচিল্লির কারণটও বুঝলাম। বস্তা দখল করে রাখা বাসের মাঝখানের জায়গাটা দিয়ে আমার মত ছেলে মানুষই পার হতে পারবে। কিন্তু মহিলাদের পক্ষে তো আর সম্ভব না। তাই মহিলারা চিৎকার শুরু করেছে। যার যার বস্তা সে সে সরিয়ে নিতেও চেষ্টা করছে। আপাতত যে যার সিটে রেখে নামবে হয়ত। আমি আবারও চেয়ারে হেলান দিলাম। সবাই না নামলে তো আমিও বের হতে পারবো না। অপেক্ষা করি। পেটটা চিনচিন করছে। সকালে নাস্তা খাওয়া হয়নি। এক গ্লাস পানি খেয়ে পান্নু ভাইয়ের বাসা থেকে বের হয়ে গেছি। সেই এক গ্লাস পানি তলপেটে জমা হয়ে তীব্র বেগের সৃষ্টি করেছে। তারা বের হতে চায়। কিন্তু এই মুহূর্তে সময় দরকার।

বাসটা খালি হলো। আমি ধীরে ধীরে নেমে রেস্ট্রুরেন্টে গিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকলাম। প্যান্টের চেইনটা খুলে শুরু করলাম সকালের একগ্লাস পানি নির্গমন। আহ্! এ যেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শান্তি।

পরোটা এবং সবজি দিয়ে খেয়ে এক কাপ চা। এর চেয়ে সেরা খাবার নেই। শেষে একটা বেনসন লাইট। জীবনের চাওয়া খুব ছোট। তীব্র খিদায় দুইটা পরোটাই যথেষ্ঠ। নিজেকে চাঙ্গা করতে চায়ের পর সিগারেট। আর কি চাই?

সিগারেটটা খেতে খেতে বাসের সামনে দাঁড়াতেই সুপারভাইজার বলে উঠলো, স্যার উঠেন। আপনের জন্য ওয়েট করছি। যাক বাবা! আজকালতো কেউ কারও জন্য অপেক্ষাই করে না। সেখানে বাসের গোটা পঞ্চাশেক যাত্রীকে আমার জন্য অপেক্ষা করিয়ে রেখেছে সুপাইভাইজার। যাইহোক, আমি আবার লাফ দিয়ে বাসে উঠতেই অবাক হয়ে গেলাম। মাঝখানের হাঁটার জায়গাটা একদম ফকফকা। সবাই বস্তা যে যার কোলে নিয়ে বসে আছে। বাস ততক্ষণে স্টার্ট দিয়ে দিল। আমি এগিয়ে যেতে যেতে থমকে দাঁড়ালাম। বুকের ভেতর একটা তীব্র ঝাকুনি খেলাম। এক জোড়া ক্লান্ত চোখ আমার দিকে স্থির হয়ে তাকিয়ে আছে। ভ্রুটা কুঞ্চিত। দৃষ্টিতে প্রচণ্ড বেগ আছে। খুঁটিয়ে দেখার আপ্রাণ চেষ্টা আছে। যে চোখ দুটি আমার ভেতরের মানুষটাকেও চিনে ফেলার ক্ষমতা রাখে। তারপরও আমি ধীরে ধীরে পেছনে গিয়ে বসি। আমার সমস্ত শরীর অবশ হয়ে আসছে। চোখটা কাঁপছে। বুকের ভেতর ধ্বক ধ্বক আওয়াজটা আমি নিজেও শুনতে পাচ্ছি। পাশের লোকটি এখন আর কাঁদছে না। সে আমাকে প্রশ্ন করে বসল, কি হইছে ভাই?

আমি কিছুটা বিব্রত হলাম। লোকটি আমার বুকের ভেতরের আওয়াজ শুনে ফেলেনি তো! তারপরও জবাব দিলাম, কই কিছু না তো?

সে বলল, না আপনি ঘামছেন।

আমি তাকে আর কিছুই বলিনি। চোখ বন্ধ করে বসে আছি।

কত বছর হবে? দশ কিংবা বারো বছর? কত বছর পর একজন মানুষের সঙ্গে দেখা! শেষ দেখায় আমার বয়স ২৯ ছিল। এখন আমার বয়স ৪০ ছুঁয়ে গেছে। তাহলে তো দশের বেশিই হবে। এতো বছর পর একজন মানুষকে দেখে কি সেই আগের মতই অনুভূতি জেগে উঠবে? এমনটা কি হয়? শুনেছে কেউ কখনও?

আপনারা নিশ্চয় ভাবছেন কাকে দেখেছি? অনেকে ধরেই নিয়েছেন আমার পূর্ব প্রেমিকাকে দেখেছি। হ্যাঁ প্রিয় পাঠক, আমার পুরনো প্রেমিকা তানিকে দেখেছি। কেমন যেন হালকা হয়ে যাচ্ছে লাইনগুলো। এর চেয়ে শক্ত লাইন আর কি লিখবো? কত বছর পর তানিকে সামনে পেলাম। তাও কোনো এক বাসে যাত্রা পথে! অথচ কি আশ্চর্য দেখুন, দুজন একই শহরে থাকি। এক শহরে জীবন কাটাচ্ছি কিন্তু কোনোদিন একটি মুহূর্তের জন্যও কেউ কারও মুখোমুখি হয়নি। আজ হতে হলো! তাও এখানে?

আমার দিকে তাকিয়ে তানির তীব্র সন্ধানী চোখ আমি ভুলতেই পারছি না। তার চোখে হাজারো জিজ্ঞাসা ছিল। এতো প্রশ্ন সেখানে যা আপনাদের বোঝানোর ভাষা আমার নেই। তানির সঙ্গে আমার জীবনের কৈশোর এমনকি বলতে পারেন পরিণত সময়টাও কেটে গেছে। দুজনের আড্ডা, গল্প, ঝগড়া দিয়ে ৮ বছরের প্রেমকে ফেলে তানি একদিন বিয়ে করে চলে গিয়েছিল।

তবে তো প্রেমের দিনগুলো ভুলবার না। দুজনে যান্ত্রিক শহরে এক সময় কলেজের ইউনিফর্ম পরে রিক্সার হুড উঠিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছি। মনে ছিল ভয়, শংকা। কেউ না জানি দেখে ফেলে। কেউ দেখলেই তো কাজ সারা। যখন কলেজ পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে উঠলাম তখন তো রিক্সার প্রেম হয়ে উঠেছিল আরও রঙিন। আমরা তখন রিক্সার হুড নামিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছি। বৃষ্টিতে ভিজেছি। আইসক্রিম, ঝাল মুড়ি খেয়ে দুজন দুজনের গা ঘেষে বসে থেকেছি। আহা! সেই সব মুহূর্ত। এখন এই সবতো স্মৃতি। যেসব স্মৃতি মনে করে লাভ নেই। দুজনের পথটা বদলে গেছে।

আমরা একই এলাকা থাকতাম। সেখানেই পরিচয়। সেখানেই প্রেম। আমাদের বাসার গলিতে এসে তানি দাঁড়াতো। আমি বাসা থেকে বের হয়ে এসে সেই সরু গলিতে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো রিক্সায় টুপ করে উঠে পড়তাম। আমার বাসার সেই গলিটি এখনও সরুই আছে। এখনও বদলায় নি। ঠিক যেভাবে আমরা রেখে এসেছি। সেই গলিতেই আমি প্রথম তানির হাত ধরেছিলাম। আমার বাসার নির্জন সিঁড়ির করিডরে আমার ঠোঁট প্রথম স্পর্শ করেছিল তানির ঠোঁট জোড়া। থরথর করে কাঁপতে থাকা তানিকে আমি প্রশ্ন করেছিলাম, কাঁপছ কেন? তানি আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিল, জানি না। ভয় লাগছে।

তানির ভয় ভাঙাতে আমি আবার ওকে চুমু দিই। তানি আমাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। পৃথিবীর কোনো অনুভূতি যদি পরবর্তী জীবনে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে তবে আমি সেদিনের অনুভূতি নিয়ে যেতে চাই। আজও এখনও মনে হলে আমার শরীরের লোমগুলো দাঁড়িয়ে যায়। মনে হয়, পৃথিবীতে ওই একটি দিনের স্মৃতি দিয়েই তানি আমার কাছে বেঁচে থাকতে পারে।

কিন্তু কোনো অনিশ্চিত ছেলের সঙ্গে তানির তো জীবন চলবে না। আমি অনিশ্চিত জীবনের মানুষ। জীবনের কোনো লক্ষ্য কিংবা উদ্দেশ্য নেই। লক্ষ্যহীন একটা ছেলের সঙ্গে সংসার করার চিন্তা তানি করেনি। তাই হয়ত আমাকে ছেড়ে কোনো এক নিশ্চিত শক্ত সামর্থ্য ছেলের সঙ্গেই সংসার বেঁধেছে। আমার এক বন্ধু একদিন তানির বিয়ে, ছবি নিয়ে আমাকে দেখিয়ে বলছিল, দেখ তোর প্রেম। সুখে আছে। আর তুই শালা মরতে যাচ্ছিস।

সেদিন সত্যিই বরের পাশে বউ সেজে হাস্যজ্জ্বল তানিকে দেখে বড্ড কষ্ট হয়েছিল। যে স্মৃতি আমি ভুলে যেতে চাই। বরের পাশে বসে তানি হাসছে। আঁড় চোখে বরকে দেখছে। পৃথিবীর সবচেয়ে বিভৎস ছবি। যে ছবিটি এখনও আমার চোখের সামনে টগবগ করে জ্বলে ওঠে। উফ! কি যন্ত্রণা জীবনের। এতো যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে থাকা একটা বোঝা। যে বোঝা আমি চাইনি। আমাকে তো চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেদিন থেকে তানিকে আমি প্রচণ্ড ঘৃণা করা শুরু করেছিলাম। এতো প্রিয় মুখ। যে মুখের হাসি দেখার জন্য আমি উš§ুখ হয়ে থাকতাম। অথচ সেই হাসি মাখানো মুখটাই আমার কাছে বিভৎস হয়ে উঠলো। কখনও কখনও প্রিয় মানুষের মুখ বিভৎস কুৎসিত হয়ে ওঠে।

পাশের লোকটি হুট করেই আবার কেঁদে ওঠে। আমিও যেন একটা ঘোর থেকে বের হই। দেখলাম কখন নিজের অজান্তে গালে হাত দিয়ে বসে আছি। নিজের অজান্তেই গালে হাত দিয়ে গভীর ভাবনায় মগ্ন হয়ে ভাবছি তানির কথা। আজ কত বছর পর তানির প্রশ্নমাখা চোখগুলো আমাকে দেখেছে। মনে এক ধরনের আনন্দ লাগছে। কত বছর পর!

বাস ঢাকাতেই ঢুকে গেছে। গাবতলী পার হচ্ছে। জায়গায় জায়গায় মানুষ নেমে যাচ্ছে। বাসটাও খালি হয়ে যাচ্ছে। আমি তখন ভাবলাম সামনে গিয়ে বসি। আর তাছাড়া তানিকে দেখাও যাবে। আমি প্রথম থেকে তিন নম্বর সিটে গিয়ে বসলাম। তার কিছুক্ষণ পরই দেখি আমার পাশে একটা ছেলে কাঁধে ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়েছে। বয়স ৮ অথবা ১০ বছর হবে। মাথা ঘুরিয়ে পেছনে তাকাতেই দেখি ছেলেটার পেছনে তানি দাঁড়িয়ে আছে। সেই একইভাবে। আমার দিকে গভীর দৃষ্টি। আমাকে দেখার এক আকুল আবেদন তার চোখে। তবে তানির চোখ বড় ক্লান্ত। জীবনের গ্লানি তার চোখগুলোকে খেয়ে ফেলেছে। চোখে আইলাইনার ব্যবহার করে না। মাথায় টিপ নেই। মুখে সেই মিষ্টি হাসি নেই। শুধু গ্লানি। ছেলেটি তানিরই সন্তান হয়ত। তানিকে খুব প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করছে, কেমন আছো? কিন্তু এই প্রশ্নটি করারও সাহস নেই। বাস চলছে তীব্র বেগে। একবার যদি জিজ্ঞেস করতে পারতাম। হয়ত তানিও প্রশ্নটি করতে চায়। পারছে না। ও কখনই আমাকে মনের কথা বলতে পারেনি। আমাকেই খুুঁচিয়ে বের করতে হয়েছে। কিন্তু এখন তো দুজনের কাছে দুজনই অচেনা। অচেনা কাউকে প্রশ্ন করা কি ঠিক?

বাসের স্পিড ধীর হয়ে আসছে। পরের স্টপেজেই তানি নেমে যাবে। প্রশ্নটা করতে পারছি না। মুখেই আছে। শুধু আওয়াজ বের করতে হবে। হচ্ছে না। বাসটা থেমে গেল। ছেলেটা সামনে এগিয়ে গিয়ে নামার সিঁড়িতে পা ফেলল। তানিও এগিয়ে গেল। আমার পাশ ঘেঁষে সামনে গেল। আমি হালকা ঘামের গন্ধ পেলাম। যে গন্ধটাও অপরিচিত। হুট করেই তানি পেছনে তাকালো। চোখটা তখন ছলছল করছে। যেন গভীর অপরাধবোধ নিয়ে আমার দিকে তাকিয়েছে। ছলছল দৃষ্টিতে আমাকে তানি বলল, ‘ভালো থেকো’।

তানি বাস থেকে নেমে গেল। বাস টানছে। তীব্র বেগে এগিয়ে যাচ্ছে। ঈদের ছুটির আমেজ এখনও ঢাকাকে ছাড়েনি। রাস্তাঘাটগুলো ফাঁকা। বাস তার যাত্রা অবিরামভাবেই করছে। তীব্র বেগে ছুটছে। আমি ভাবছি, জীবন এমনই ছুটে যাওয়া। আমি-তানি একসময় পাশাপাশি ছিলাম। হুট করেই জীবনের পথ বদলে গেল। আমাদের স্মৃতিমাখা সবকিছুই রয়ে গেল। তারপরও মাঝে মাঝে মনে পড়ে সেই দিনগুলো। যখন তানি এবং আমি ছিলাম পাশাপাশি দুটি গলিতে। এখন সেই গলিতে তানি নেই। আমিও নেই। কিন্তু সরু সেই গলি দুটি রয়ে গেছে। শুধুমাত্র দুজনের পথ ভিন্ন হয়ে গেছে। দুজনের ভাবনাও পাল্টে গেছে। তারপরও কোথাও যেন একসঙ্গেই রয়ে গেছি। কোথাও যেন দুজন একসঙ্গে মিশে যাই।

মাঝে মাঝে ভাবি একা থাকাই ভালো ছিল। একা একা জীবন চলে যায়। কিন্তু দীর্ঘপথ একজন মানুষের সঙ্গে যখন মন দেহ অভ্যস্ত হয়ে যায় তখন পাশের মানুষটি চলে গেলে জীবনটা বিষাদে ভরে ওঠে। এভাবে একা বেঁচে থাকা যন্ত্রণার।

প্রতিটি অনুভূতির সঙ্গে যে মানুষটি লেপটে আছে তার সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হলেই সেসব অনুভূতি থেকে মুক্তি পাওয়া হয় না। আজীবন সেই সাইকেলে মানুষ আটকে যায়। প্রেমের প্রথম উত্তেজনা প্রতিটি মানুষের হƒদয়ে আটকে যায়। তবু মানুষ পথ চলে। অনির্দিষ্ট যাত্রায় প্রতিটি মানুষই যাত্রা করে। কেউ থেমে থাকে না। প্রত্যেকেই চলে। যেভাবে আজ যাত্রাপথে তানির সঙ্গে দেখা হলো। যাত্রাপথেই তানি নেমে গেল। আমি তো চলছি। তানি নেমেছে বলে পেছনে একবার ফিরেও তাকাইনি। পেছনে কেউ তাকাতে চায় না। পেছনের স্মৃতি বড় যন্ত্রণার। বড় বেদনার। সে বেদনার চেয়ে সামনের অনির্দিষ্ট পথে যাত্রার পথটাই সুন্দর। 