প্রেম-বিপ্লব-সম্পর্কের টেলিভিশন

বাংলাদেশের গ্রামের মানুষের মন কেমন? এ প্রশ্নের উত্তরে প্রথম যে কথাটি উঠে আসবে, সেটি হলো- গ্রামের মানুষের মন ধর্মভীরু। আর এই ধর্মভীরু মানুষের মন নিয়েই মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ছবি ‘টেলিভিশন’।

televisionতবে ধর্ম বিষয়টা স্পর্শকাতর। এ বিষয়ে খুব বেশি উচ্চবাচ্য করা কঠিন। এজন্যই নির্মাতা খুব কোমলভাবেই ধর্ম নিয়ে কাজ করেছেন। এদেশে ঘটে যাওয়া অসংখ্য ঘটনাকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন ফারুকী। ছবির শুরুতেই পত্রিকার পাতায় নারীদের ছবিগুলোকে শাদা কাগজে ঢেকে দিচ্ছেন একজন মানুষ। কিন্তু মনের চাহিদা মেটাতে উঁকি দিয়ে ঠিকই ছবি দেখে মন ভরাচ্ছেন। অন্যদিকে এ পত্রিকার পাঠক আমিন চেয়ারম্যানের সামনে মাইক হাতে সাংবাদিক। দুজনের মাঝখানে বিশাল শাদা কাপড়। কারণ সাংবাদিক একজন নারী।

কোনো নারীর সামনে আমিন চেয়ারম্যান আসবেন না। এভাবেই গল্পের শুরু। যে গল্পে বলা হয় পানিঘেরা গ্রামের গল্প। যে গ্রামে আধুনিকতার ছোঁয়া লাগাতে দেন না চেয়ারম্যান। ধর্মীয় বিশ্বাসকে টিকিয়ে রাখতে তার আপ্রাণ চেষ্টা। যে চেষ্টায় গ্রামে তরুণদের হাতে পৌঁছায়নি মোবাইল ফোন এবং কারও ঘরে নেই টেলিভিশন।

গল্পে তখনও টেলিভিশনের কথা আসেনি। এসেছে মোবাইলের কথা। খুব চমৎকারভাবে প্রযুক্তির ব্যবহার তুলে এনেছেন ফারুকী। তরুণদের মোবাইল ফোনের প্রয়োজনে কোহিনুর চরিত্রটি বিস্তার লাভ করা শুরু করে। কোহিনুর গ্রামের মেয়ে হলেও আধুনিক। গঞ্জে গিয়ে বাবার সঙ্গে স্কাইপে কথা বলে। অর্থাৎ প্রয়োজনের তাগিদেই কোহিনুর আধুনিক হয়ে উঠেছে। যে আধুনিকতায় প্রেমও উঠে আসে। আমিন চেয়ারম্যানের ছেলে সোলায়মানের সঙ্গে তার প্রেম। লুকোচুরি করে দেখা করা, মিনিটখানেক কথা বলা- এ দিয়ে কি প্রেমের স্বাদ মেলে? ঠিক তখনই উঠে আসে মোবাইল ফোনের কথা। কোহিনুর সোলায়মানকে মোবাইল ফোন কেনার বুদ্ধি দেয়। তবেই তো তাদের কথা হবে। রোমান্টিক কথা বলে মনের স্বাদ মেটাবে।

ফারুকীতখনও সোলায়মান বিপ্লব করেনি। রাগী ধর্মীয় পিতার সামনে মায়ের মাধ্যমে মোবাইলের আবদার জানায়। ব্যবসায়িক কাজে মোবাইল জরুরি। এ বিষয়টিই পিতার কাছে তুলে ধরে। কিন্তু পিতার কাছে এ প্রয়োজনীয় যন্ত্রটির মূল্য নেই। যদিও তিনি নিজে মোবাইল ব্যবহার করেন। কিন্তু তরুণদের হাতে গেলে তারা পাপে লিপ্ত হবে। এ বিশ্বাসের কাছে সোলায়মানের পরাজয় ঘটে। তবে সোলায়মানের সহকারি মজনু বিষয়গুলো খেয়াল করে। তখনও মজনুর চরিত্রটি বিস্তার লাভ করেনি। শুধু বোঝা যাচ্ছিল কোহিনুরের প্রেমে সেও হাবুডুবু খাচ্ছে। সে বারবার কোহিনুরকে প্রেমের কথা বলতেও যায়। কিন্তু সাহসে কুলায় না।

মজনুর বুদ্ধিতেই অবশেষে সোলায়মানের হাতে মোবাইল আসে। শুরু হয় প্রেম। নিজের কাজের জায়গায়, ঘরে; এমনকি বদনা হাতেও সোলায়মানের প্রেম আলাপ বন্ধ হয় না। কল্পনার জগতে সোলায়মান। ফারুকীর নিজস্ব ভাষায়, সোলায়মান তখন মনের টেলিভিশন চালু করে দেয়। যেখানে তাদের জগৎ তৈরি হয়। যে জগতে দুজন ছাড়া আর কেউ নেই। কল্পনার টেলিভিশনে নায়ক নায়িকা চরিত্রে সোলায়মান ও কোহিনুর।

মাঝখানে যদিও মজনু তার প্রেমের কথা বলে ফেলে। কোহিনুরের সঙ্গে তার পার্থক্য আকাশ পাতাল। গ্রামের অশিক্ষিত মূর্খ মজনু। একথা সে খুব ভালোভাবেই জানে। সে সোলায়মানের চাকরি করে। সুতরাং এ দেয়ালটিও তার কাছে প্রেমের বাঁধা। কোহিনুর তাকে ভালোবাসে না। কিন্তু ঘৃণার কোনো চিহ্নও ছবিতে ফুটে ওঠেনি। দর্শক হিসেবে বলতেই পারি, নারীর রহস্যময়ী আচরণ উঠে এসেছে ছবিতে। রহস্যময়ী প্রগতিশীল কোহিনুরের সঙ্গে মজনুর দূরত্ব কোনোভাবেই মেটে না। কিন্তু কোহিনুরের আশেপাশে থাকতে সে পছন্দ করে। কোহিনুরের ভালো লাগা মন্দ লাগার দিকে খেয়াল রাখে। এ বিষয়টি আমরা বুঝতে পারি যখন দেখি কোহিনুর বলে, গোঁফওয়ালা ছেলে তার পছন্দ নয়। ঠিক তখনই মজনু নিজের গোঁফ কামিয়ে ফেলে। এবং এ সংবাদ সে কোহিনুরকে জানায়। মুখে নয়। ইশারাতেই কোহিনুরকে বলে যায়। কোহিনুর বোঝে। বুঝেও অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে। মজনুর ভালোবাসাকে হয়ত সে সম্মান করে। হয়ত মজনুকে সেও হারাতে চায় না। মজনুকে তার হারানো উচিতও নয়। কারণ সোলায়মানের বার্তা মজনুর মাধ্যমেই কোহিনুরের কাছে পৌঁছায়।

এভাবেই গল্প এগিয়ে চলে। ঠিক তখনই গ্রামে প্রবেশ করে টেলিভিশন। এক হিন্দু শিক্ষকের সাইকেলে চড়ে গ্রামে টিভি আসে। গ্রামে মুসলমানদের টিভি দেখা নিষেধ। ধর্মের ব্যাখ্যায় টেলিভিশনে ছবি দেখা হারাম। সুতরাং টেলিভিশনে মানুষের ছবি দেখা যায়। টেলিভিশন হারাম। কিন্তু হারাম-হালালের বিষয়ে হিন্দুরা জড়াবে না। গল্পে তখন ধর্মগোয়াড় চেয়ারম্যানের অন্যরূপ উঠে আসে। যদিও ধর্মের প্রতি তার অগাধ ভালোবাসা। যদিও তার বিশ্বাস-অবিশ্বাস সে অন্যের ওপর চাপিয়ে দেয়। কিন্তু অন্য ধর্মের বিষয়ে তিনি বলেন, অন্য ধর্মের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ আমি করতে পারি না।

অন্য ধর্মের প্রতি চেয়ারম্যানের শ্রদ্ধা দর্শক দেখতে পায়। তাই সে সিদ্ধান্ত নেয়, মাস্টারের ঘরে টেলিভিশন চলবে কিন্তু কোনো মুসলমান দেখতে পারবে না। গ্রামের নতুন আইন কেউ মানে না। দলে দলে মাস্টারের ঘরে ভিড় করে। মাস্টারের বারণ কেউ শোনে না। তারা বিনোদন পেল। গ্রামের মানুষ জানালার ফাঁক দিয়ে দেখে চলে টেলিভিশন। সে দলে যোগ দেয় কোহিনুর। কিন্তু মানুষের ভিড় ঠেলে কেন কোহিনুর টেলিভিশন দেখবে? হাজার হোক সে চেয়ারম্যানের একমাত্র ছেলের প্রেমিকা। ক্ষমতার ব্যবহারও উঠে আসলো ছবিতে। মজনুর মাধ্যমে খবর দেওয়া হলো, কোহিনুরকে ঘরের ভেতরে ঢুকে টেলিভিশন দেখতে না দেওয়া হলে চেয়ারম্যানের কাছে খবর যাবে মাস্টারের টেলিভিশন মুসলমানরাও দেখে। সুতরাং ক্ষমতার কাছে পরাজিত হয় মাস্টার। কোহিনুর ঢুকে যায় মাস্টারের ঘরে।

এতোক্ষণে মুসলমানদের টিভি দেখার খবর চলে গেছে চেয়ারম্যানের কানে। চেয়ারম্যান চলে আসে হিন্দু মাস্টারের ঘরে। সেখানে আবিষ্কৃত হয় মুসলমানদের টেলিভিশন দেখার খবরের সত্যতা। প্রমাণ হিসেবে পাওয়া যায় কোহিনুরকে। গ্রামের মানুষের সামনে কোহিনুরকে তিনবার কান ধরে উঠবোস করতে বলা হয়। ঠিক তখনই বদলে যেতে থাকে গল্প।

গল্পে আবারও পরিবর্তনের ছোঁয়া দেয় কোহিনুর। এর আগে মোবাইলে কথা বলা, এমনকি স্কাইপিও নিয়ে এসেছে সে। এখন তিনবার কান ধরে উঠাবসা করতে বলা কোহিনুর তিনবার নয়, সে বারবার করতে থাকে। এ যেন তার প্রতিবাদ। তীব্র অপমানের প্রতিবাদ সে চেয়ারম্যানের সামনেই করে ফেলেছে। অসংখ্য গ্রামের মানুষের সামনে তিনবার আর একশোবার করে কান ধরে উঠাবসা সমান। সে থামেনি। সে চেয়ারম্যান না যাওয়া পর্যন্ত এ প্রতিবাদ করে গেছে। তীব্র অপমানে ক্ষোভে জ্বলতে থাকা কোহিনুর নিজের ভালোবাসাকেও তখন প্রত্যাখান করে। কারণ সোলায়মান চেয়ারম্যানের ছেলে।

গল্পের বাঁক বদলে গেল। দুজন দুপ্রান্তে কষ্টে হাহাকারের সমুদ্রে ডুবে গেল। ঠিক তখনও মজনু সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু সোলায়মানের প্রতি তার মায়া যেন হৃদয়ের মধ্যেই রয়ে যায়। বেঈমানী করার ভাবনা আসলেও সে করে না। কিংবা করে ফেললেও নিজেকে আটকে ফেলে। এটা হতে পারে চাকরি হারাবার শংকা। আবার হতে পারে সোলায়মানের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা।

দুজনকে একসঙ্গে করার কাজেও মজনুকে আমরা দেখতে পাই। মজনুর মাধ্যমেই পিতার বিরুদ্ধে দাঁড়াবার কথা বলে কোহিনুর। সোলায়মান প্রথমে এর প্রতিবাদ করলেও একপর্যায়ে দেখা যায় সে বিপ্লব করে ফেলে। গ্রামের সব তরুণদের নিয়ে পিতার বিপক্ষে শক্ত অবস্থান সে নিয়ে ফেলে। নির্বাক পিতা যেন আঁতকে ওঠেন। পিতা পুত্রের সম্পর্কের দুরত্ব এবং দুই ফিলোসফি ছবির শুরুতেই দেখে এসেছি। কিন্তু এবার দুজন যখন মুখোমুখি ঠিক তখনই দেখা দেয় জন্মের টান। দুজনের মনের মধ্যেই রয়ে গেছে অকৃত্রিম ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, মায়া। পিতার কান্নায় তা প্রকাশ পায়। তিনি যখন সৃষ্টিকর্তার কাছে হাত তুলে সন্তানের মঙ্গল কামনা করেন। তিনি যখন বলে, আমি মনে কষ্ট পাই নাই। তুমিও কষ্ট পাইয়ো না আল্লাহ। ঠিক তখনই পিতার অপমানের মাঝেও সন্তানের প্রতি তীব্র ভালোবাসার অনুভূতির প্রকাশ ঘটে।

যে সন্তান বিপ্লব করে ফেলল, সেও অপরাধবোধে ভুগতে শুরু করে। যে অপরাধের কথা সে কোহিনুরকে জানাতে গিয়ে বলে, ‘আমি তো আমার আব্বারে মাইরা ফেললাম কোহিনুর’। বিপ্লবের প্রদীপ যেন নিভে গেল। যে ছেলে একদিন আগেই বিপ্লব করলো। সেই ভালোবাসার শ্রদ্ধার মায়াজালে জড়িয়ে গেল। মনের কাছে হার মানতে হলো। মনের টেলিভিশনে তখন তার শুধুই কষ্ট। যে কষ্ট নিয়েই পিতার পা ধরে মাফ চাইল সোলায়মান। বিপ্লব অসমাপ্ত রয়ে গেল। স্পষ্ট হলো, দু প্রজন্ম কখনও একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। তাদের দুজনকেই দুজনের দরকার। দুজনই দুজনকে ভালোবাসে। দুজনেরই দুজনের প্রতি রয়েছে গভীর মমতা। যা শুধু রয়ে যায় মনের টেলিভিশনে। যা তারা ভেতরে অনুভব করে। কিন্তু প্রকাশ করতে পারে না।

টেলিভিশন ছবিতে চেয়ারম্যান একজন অটল মানুষ। তিনি কোনো সমঝোতা করেন না। কিন্তু তিনি এ নিয়ে বহুবারই সমঝোতা করে ফেলেছেন। তিনি গ্রামে মোবাইল ফোন ব্যবহারের অঅনুমতি দিয়েছেন। ছেলের প্রতি গভীর মমত্ববোধে আটকে কোহিনুরকে বউমা হিসেবে গ্রহণ করেছেন। আবার তার সমঝতার প্রসঙ্গ উঠে আসে। যখন তিনি হজ্জে যাবেন। ছবি তুলতে হয় তাকে। হজ্জে যদিও তিনি আর যেতে পারেন না। রঙচঙা ঢাকায় এসে আশেপাশে অসংখ্য বিলবোর্ড দেখে হতাশ হতে থাকেন। তিনি তো এগুলো মেনে নিতে পারেন না। তিনি অবাক হয়ে দেখেন। হয়ত ভাবছেন, গ্রামের সেই গহীনে তিনি একাই ধর্ম পালন করে চলেছেন। এ শহর বোধ হয় নিজস্ব ধর্ম হারিয়েছে।

হজ্জে যেতে না পেরে ঢাকার এক হোটেলে হতাশার সময় কাটাতে থাকেন চেয়ারম্যান। একদিন হুট করেই হজ্জের তওয়াফের আওয়াজ শুনতে পান। তিনি রুম থেকে বের হন। দেখেন সামনের টিভি থেকে আওয়াজ আসছে। তিনি তখন হোটেল বয়কে তার রুমের টিভি ছেড়ে দিতে বলেন। চেয়ারম্যান শেষ পর্যন্ত আবারও সমঝোতা করলেন। সৃষ্টিকর্তার নৈকট্য লাভে তিনি তখন কান্নায় ভেঙে পড়েন। বলে ওঠেন, আমি তোমার দরবারে হাজির আল্লাহ। তোমার দরবারে হাজির। অর্থাৎ মনের মধ্যে তিনি হজ্জে হাজির হয়ে গেছেন। শেষ হয় টেলিভিশন।

এ ছবিটিতে প্রতিটি চরিত্রকে ফারুকী বিশ্লেষণ করছেন। ছোট ছোট চরিত্রগুলোও ব্যাখ্যা করা যাবে। শ্রেণীগত পার্থক্যও দেখা যাবে। তবে ওপরের শ্রেণীর মানুষদের যে নিচের শ্রেণীর মানুষের প্রয়োজন বেশি- সেটি খুব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ছবিতে। এ ছবিতে মজনু অসহায় চরিত্র। তার কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই। কিন্তু অজানা কিছু পাওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে সে ছবিতে শেষ পর্যন্ত থেকে যায়। যদিও বিদায় নেয় সে। কিন্তু তার যাওয়া হয় না।

মানুষের মন এমনই। চিরজীবন সে অজানা কিছু পেতে চায়। কিংবা যা পেতে চায় তা সে পাবে না। এ কথা জেনেও সে পাওয়ার স্বপ্ন দেখে। এ স্বপ্ন অপরাধের না। এ স্বপ্ন নিজস্ব। অন্যদিকে গল্পে বিপ্লব হয়। যে বিপ্লবের প্রধান কারণ প্রেম। সোলায়মান-কোহিনুরকে ধরে গল্পের প্রেক্ষাপটে আছে আধুনিকতার ছাপ, আছে ব্যক্তিগত সম্পর্কের টানাপোড়েন। এভাবেই প্রেমের কথা, সম্পর্কের গল্প নিয়ে ফারুকীর টেলিভিশন অনবদ্য।