তোমার আমার ঠিকানা (পর্ব-১)

(উত্তাল শাহবাগ। উত্তাল প্রজন্ম চত্বর। উত্তাল সারাদেশ। এমন সময়কে ধারণ করেই এ গল্প। শুরু হয়েছিল গল্পের ধারণা থেকেই। তবে এ ইতিহাস ধারণ করতে গিয়ে হয়ে পড়ছে বড় গল্প। উপন্যাসও হয়ে যেতে পারে। প্রথম পর্ব দিয়ে শুরু করলাম। তথ্য বিভ্রাট থাকলে বলবেন। ঠিক করে নেব। সময় হোক গল্পে লালন। )

 

সকালে পত্রিকা দেখে মনটা উত্তেজনায় ভরে গেল। রাতে টিভি দেখা হয়নি। ফেসবুকেও লগইন হতে পারিনি। অনেক রাত করে বাড়ি ফেরার এই এক মুশকিল। দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে হয়। রাতে এসেই খেয়ে ঘুমের সাগরে ডুব দিয়েছিলাম। তাই দেশের এতোসব কান্ডও দেখা হয়নি। শুধু জানি আজ হরতাল। পত্রিকার প্রথম পাতায় বড় করে লেখা, ‘এ রায় মানি না’।

মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্স বলে যে জব্বর মতবাদ বইয়ে পড়েছি। সেটার একটিই হলো এটি। রায় মানছে না মিডিয়া। এ যেন মনের কথা। একজন মানুষের ৪০০ খুনের রায় হবে যাবজ্জীবন?! অসম্ভব! হতেই পারে না।

চা নিয়ে সামনে আমার মা হাজির। বলল, দেখেছ অবস্থা? অবশেষে সরকার তবে যুদ্ধাপরাধী দলের সঙ্গে আঁতাত করছে। কি যে হবে এ দেশের!

আমি চায়ে চুমুক দিতে দিতেই পত্রিকায় চোখ বুলাই। দেখতে পাই শাহবাগে তরুণরা অবস্থান ধর্মঘট করছে। এটি নিয়েও মা-কে বলি, তরুণদের প্রতিরোধ! পড়েছো নিউজটা? হরতাল করার সাহস আছে জামাত-শিবিরের?

আম্মু বলে, পড়েছি মানে? তুমি তো দেখি কিছুই জানো না। আমাদের ছেলেমেয়েরা গতকাল বিকেল থেকেই রাস্তায়। যাক অন্তত প্রতিবাদ তো জানাতে পারলো। টিভিগুলো তো লাইভ দিচ্ছে কিছুক্ষণ পর পর।

আমি তো অবাক। তরুণরা আজকাল প্রতিরোধ করতে জানে নাকি? অবশ্য নিজেকেও তরুণদের কাতারে ফেলতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করে চাকরি করছি ৪/৫ বছর হয়ে গেছে। বিয়ে করিনি। আমার মায়ের ছোট ছেলে হিসেবে তার ধারণা আমি এখনও ছোট। বিয়ের বয়স হয়নি। জানি না বয়সটা কবে হবে। ত্রিশের কোটা পার করে ফেললাম কিন্তু মায়ের চোখে এখনও বিয়ের পাত্র হওয়ার যোগ্যতা হলো না।

যাইহোক। টিভি ছেড়েছি। বিজ্ঞাপনের জ্বালায় আজকাল টেকা মুশকিল। আমরা যেন ধীরে ধীরে বিজ্ঞাপনের উপরই বাস করি। কখন দেখতে পাবো সংবাদ। ঘণ্টায় ঘণ্টায় সংবাদ দেখি, কিন্তু বিজ্ঞাপন দেখি মিনিটে মিনিটে। এসব যখন ভাবছিলাম তখনই মৃদুল ফোন।

ফোন ধরতেই তার আর্ত-চিৎকার, শালা ঘরে চুড়ি পইরা বইসা আছস? রাস্তায় আয়।

আমি তো অবাক! হারামজাদা বলে কি! বললাম, বউয়ের দাবরানি খাও সেকেন্ডে সেকেন্ডে আর কও আমি চুড়ি পরছি।

মৃদুল হাসতে হাসতে বলে, দোস্তো কালকে রাতে শাহবাগ গেছিলাম। যাইয়া কলিজাটা ভইরা গেছে। আমরা যে প্রতিবাদি জাতি তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ ওইখানে গেলেই দেখতে পাবি।

আমি বললাম, ঠিকাছে। যাবো। অফিস শেষে বিকালে রওনা দিব। তবে তুই কি এখন ওখানে নাকি?

- না দোস্তো। এখন অফিসে। আমিও সন্ধ্যায় আসবো।

ইস্তারি করা জামা-কাপড়গুলো আমার আলমিরাতে আম্মু খুব সুন্দর করে রাখে। জীবনটা আমার বড় অগোছালো। আম্মুর জন্য কিছুটা গুছিয়ে থাকা যাচ্ছে। তা না হলে কি যে হতো কে জানে। রেডি হওয়ার আগে ভাবলাম ফেসবুকটা ঘুরে আসা দরকার। ফেসবুকে লগইন হতেই দেখি এক এলাহি কান্ড ঘটছে এ দেশে। পুরো হোম-পেইজ জুড়ে শাহবাগ। আন্দোলনের খবর। ছবি। অনেকেই শাহবাগ গিয়ে স্ট্যাটাস দিচ্ছে। কেউ শাহবাগ হয়ে ঘরে ফিরে স্ট্যাটাস দিয়েছে। এবার তো মনটাকে আটকে রাখাও কঠিন হয়ে গেল।

অফিস তো আর যেতে ইচ্ছে করছে না। ভাবলাম অফিস না গিয়েই শাহবাগ চলে যাই। বসকে ফোন দিয়ে বললাম, স্যার, আমি কি আজ ছুটি পেতে পারি?

আমার অফিসে স্যার আমাকে স্নেহ করেন। আব্দার আমি তেমন করি না। ছুটি তো নেই-ই না। উনি বললেন, ঠিকাছে। শাহবাগ যাচ্ছো নাকি?

ফটো কৃতজ্ঞতাঃ- শারমিন চৌধুরী

বললাম, জ্বি স্যার।

আমার মা অবশ্য জেনে খুশিই হলো। বয়স থাকলে আম্মুও শাহবাগ আমার সঙ্গে রওনা দিতো। ইচ্ছা প্রকাশ করতে মোটেও ভুলেনি। বললাম, ওখানে কি হচ্ছে কিছুই তো জানি না। গিয়ে আগে দেখি। নিজ চোখে না দেখলে তো বুঝতে পারছি না। তারপর না হয় তোমাকে নিয়েই যাবো।

তখনই আম্মুর চোখে জল। বলল, তোমরা জানো ৭১-এর উত্তাল সময়ে প্রতিটি আন্দোলনে আমিও ছিলাম। স্লোগানে মুখরিত ছিলাম। রাজপথে ব্যারিকেড ভেঙে কত মিছিলে অংশ নিয়েছি। স্লোগানে স্লোগানে উত্তাল সময়ে চিৎকার করে বলেছি, তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা মেঘনা যমুনা। জয় বাংলা। জ্বালো জ্বালো আগুন জ্বালো। ওহ! কি যে সময় ছিল। ভাগ্য আমাকে এমন সময় দেখিয়েছে। এর চেয়ে সৌভাগ্যের আর কি হতে পারে?

বেচারি সারাদিন ঘরে একা থাকে। জীবনের অধিকাংশই এখন ইতিহাস হয়ে গেছে। সংগ্রাম করে তৈরি করা এ সংসারে এখন তিনি গুছিয়ে রাখার ভূমিকায়। একসময় এ সংসারের একটা গ্লাসও তার হুকুম ছাড়া নড়েনি। আর আজ আমাদের মনের দিকে তাকিয়েই গ্লাস নড়ে। সারাক্ষণ আমাদের মনের দিকে মানুষটা নজর দিয়ে থাকে। আমিও প্রায়ই বলি, তুমি তো আমাদের কেন্দ্রবিন্দু। তোমার জন্যই তো ঘরে ফিরে আসি। তোমার জন্যই তো বেঁচে থাকার তীব্র আকাঙ্খা তৈরি হয়।

মুক্তিযুদ্ধের গল্প আমরা সবাই আম্মুর মুখে শুনেই বড় হয়েছি। চোখ বড় বড় সে সময়ে গল্প শুনতাম। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ। এই গল্পের কথা শোনার সময়ে আমার শরীরের লোম খাড়া হয়ে যেত। আম্মু বলতো, বঙ্গবন্ধু তো সেদিন ভাষণ দেয়নি। সেটা ছিল কবিতা পাঠ। তিনি কবি। মহান কবি। উনি বললেন, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেবো, এ দেশকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ। এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।

এগুলো শোনার সময়ে আমি আর আমার বোন হা করে শুনতাম আর উত্তেজিত হয়ে পড়তাম। যেদিন প্রথম টিভির পর্দায় এ ভাষণ দেখলাম, তখন খুব আফসস হচ্ছিল, কেন যে ওই সময়টায় জন্মাইনি। ইশ! যুদ্ধটা করা হলো না। দেশের জন্য কিছুই করতে পারলাম না।

মনে হয় দেশের জন্য কিছুই করতে পারলাম না। বাংলাদেশ সংগ্রামের ইতিহাসে ভরপুর। ভাষা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন। কিন্তু এসবকিছু মিস করলাম। নব্বয়ের আন্দোলনে তো ছোট ছিলাম। তাই অংশ নেওয়া হলো না। এগুলো ভেবে খারাপ লাগতো। মনে হতো, কেন যে জন্মটা এতো দেরি করে হলো। আমি জন্মাতে জন্মাতে কত কি শেষ। আবার বড় হতে হতে সব কিছুই শেষ। আমি তো আমার সন্তানের কাছেও গল্প করতে পারবো না। সন্তানের কাছে নায়ক হতে পারবো না। আমার সন্তানের কাছে অন্য সবার গল্প করবো। কিন্তু নিজের বীরত্বের কোনো গল্প করা হবে না। তাকে বলতে পারবো না, ওমুক দাবী আদায়ে দীর্ঘ সময় আমরা রাজপথে আন্দোলনে করেছি। বাংলার মাটিকে শত্রুমুক্ত করতে পুলিশের দৌড়ানি খেয়েছি, হুমকি খেয়েছি। কিন্তু আমরা ভয় পাইনি। আমরা নির্ভীক সৈনিক। আমরা রাজপথে রৌদ্রে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, ক্লাস পরীক্ষা বাদ দিয়ে আন্দোলন করেছি, বিপ্লব করেছি, জয় বাংলা, জয় কমরেড, প্রতিবাধ, প্রতিবাদ, প্রতিরোধ, বিক্ষোভ!

কিছুই হলো না। সবকিছু শেষ। ইতিহাসের নিজের কোনো অবদানই রাখা হলো না। ইতিহাস পড়ে পড়েই বাকি জীবনটা পার করে দেওয়া লাগবে।

২.
শাহবাগ চত্বরেই অবস্থান নিয়েছে তরুণেরা। এজন্য রাস্তায় প্রচন্ড যানজট। পৌঁছাতে সময় লাগলো দুই ঘণ্টারও বেশি। বাসে এক লোক বলছে, রাস্তায় বন্ধ থাক। অকারণে প্রতিদিন ২ ঘণ্টা যানজটে কাটাই। আজ না হয় কারণে ৪ ঘণ্টা কাটালাম। কোনো সমস্যা নাই।

মানুষের উদ্বেগ নাই। আছে শুধু অনুপ্রেরণা। বহুদিন পর জেগেছে তরুণেরা। যাদের বলা হয় ফেসবুক জেনারেশন। তারা আজ রাজপথে। না জানি কতো কষ্ট হচ্ছে। তবুও রাজপথে অক্লান্ত নির্ঘুম রাত কাটিয়ে বেলা হয়ে পড়ছে। তবু পথ ছাড়েনি। সাবাশ প্রজন্ম। তোমরাই তো পারবে।

শাহবাগ মোড়ে পৌঁছাতে দূর থেকে গর্জন শোনা যায়। স্পষ্ট স্লোগান। জ্বালো জ্বালো, আগুন জ্বালো। জামাত শিবিরের অস্তানা ভেঙে দাও গুড়িয়ে দাও। ওহ! শরীরটা ঝিমঝিম করছে। এগুলো এতোদিন গল্পে শুনেছি। শাহবাগে মানুষের ঢল। এ কোথায় এলাম। এ যেন অন্য রাজপথ। এই তো কিছুদিন আগে ভারতে এক মেয়ের ধর্ষণে এভাবেই মাঠে নেমেছিল তাদের তরুণ প্রজন্ম। শুধু নিরব ছিল আমার দেশ। প্রতিদিন খুন, ধর্ষণ, দুর্নীতির খবর তাদের বিচলিত করেনি। হয়ত করেছে। ভেতরে ক্ষোভে বিক্ষোভে ফেটে পড়েছে। কিন্তু রাজপথে নামেনি। শেষ পর্যন্ত কি হয়, অপেক্ষা করেছে দেখার জন্য।

ফেসবুক ব্লগে নিন্দা জানিয়েছে। কিন্তু রাজপথে নামেনি। সহ্যের বাঁধ আজ যে ভাঙলো। দেশদ্রোহীদের হুমকি- দেশে তারা গৃহযুদ্ধ লাগিয়ে দেবে। এ বিবৃতি সহ্য করার ক্ষমতা বুড়াদের আছে। ভয় যে তরুণরা পায় না। যে কোনো মূল্যে দেশের হুমকিকে তারা নিশ্চিহ্ন করে দেবে। শত্রুর ঠায় নাই এ দেশে। জাগো রে জাগো বাঙালি জাগো… বাঙালিকে আজ জাগিয়ে দিয়েছে এ প্রজন্ম। চোখটা যে আমার ভিজে যাচ্ছে।

কোলাহলের ভেতর ঢুকতেই স্কুলের বন্ধু জব্বারের সঙ্গে দেখা। দেখেই বলে, বন্ধু কত বছর পর দেখা।

দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরি। স্কুল ছেড়ে এসেছি সেই কত বছর আগে। তারপর জব্বারের সঙ্গে আর দেখা হয়নি। স্কুলের সবচেয়ে দুষ্ট ছেলেদের মধ্যে জব্বার একজন। থাকে পুরান ঢাকা। ওদের ছিল হোটেল ব্যবসা। পুরান ঢাকায় দুইটা বিরিয়ানি হাউজ তাদের। আমরা প্রায়ই স্কুল বন্ধুরা সেখানে গিয়ে বিরিয়ানি খেয়ে আসতাম। জব্বারের বাবা কোনোদিন আমাদের থেকে বিল নেননি। সবসময় বলতেন, যেদিন তোরা বড় হবি। চাকরি করবি। সেদিন সব বিল একসঙ্গে দিবি।

স্কুল ছাড়ার পর জব্বারের সঙ্গে কখনও রাস্তাঘাটেও দেখা হয়নি। কখনও খোঁজও নেয়া হয়নি। কারও কাছে জানতেও চাইনি জব্বার কোথায় কেমন আছে। অথচ দিব্বি একসময় ওদের হোটেলে বিনে পয়সায় বিরিয়ানি খেয়েছি। কেন যেন নিজেকে খুব স্বার্থপর মনে হচ্ছে। স্বার্থের সময় যখন যার সঙ্গে থাকা দরকার তার সঙ্গেই থেকেছি। আজ এতো বছর পর জব্বারের সঙ্গে দেখা। মনটা খুব ভালও লাগছে। মনে হচ্ছে এই বিক্ষোভে বন্ধুর সঙ্গেই থাকবো।

জব্বারকে জিজ্ঞেস করলাম, দোস্তো কই আছো?

সে খুব হাসিপ্রিয় মানুষ। স্কুল থেকেই। সবসময় কারণে অকারণে হাসে। জব্বার বলে, দোস্তো তোমরা তো শিক্ষিত। আমি এখনও অশিক্ষিত। মেট্রিকের পর আর পড়ি নাই। ভাবলাম বাপের ব্যবসা আছে। পইড়া টাইম নষ্ট। যোগ বিয়োগ করবার পারি। ওই দিয়াই ব্যবসা চালায়া যাইতে পারুম।

আমি হাসতে হাসতে বললাম, শালা বলিস কি! তুই তো ছাত্র ভালই ছিলি। এসব কু-বুদ্ধি তোর মাথায় দিল কে?

সে বলে, আরে ধুর হালা। ভালো ছাত্র দিয়া বাল ফালামু? মাস্টার্স পাশ করলেও ওই বাপের ব্যবসাই ধরা লাগতো। তো হুদাই কেন পড়তে যামু।

এসব আড্ডা বেশিক্ষণ চলে না। তারপর আমরা দুইজনই স্লোগানে তাল মিলাই। একটা মেয়ে স্লোগানের নেতৃত্ব দিচ্ছে। নাম লাকী। সে চিৎকার করে বলে ওঠে, জ্বালো রে জ্বালো। আমরা সবাই বলে উঠি, আগুন জ্বালো। লাকী বলে, জামাত শিবিরের আস্তানা। আমরা একসঙ্গে বলি উঠি, ভেঙে দাও, গুড়িয়ে দাও।

লাকীর গলায় তেজ আছে। মানুষের মনের ভেতরে দ্রুত গিয়ে আঘাত করার এক অসাধারণ ক্ষমতাও আছে। লাকী যেন হয়ে উঠবে নতুনের বজ্রকণ্ঠ। এমনই মনে হচ্ছে। এ যেন নতুনের নেতা। নেতার অভাব যে দেশে সে দেশে লাকীর জন্ম স্লোগানের জন্যই। ক-তো কাদের মোল্লা, তুই রাজাকার তুই রাজাকার।

এ স্লোগান মনে করিয়ে দেয় হুমায়ূন আহমেদকে। যখন মানুষের রাজাকার বলার অনুমতি ছিল না। তখন পাখিকে দিয়ে তিনি ‘তুই রাজাকার’ শব্দটা বলে দিয়েছিলেন। প্রথম বিপ্লব যেন হুমায়ূনের টিয়া পাখিই করে ফেলেছিল। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে পাখির বাক্য মানুষের মুখে আসতে। হুমায়ূন আহমেদ নেই। কিন্তু হাজার হাজার তরুণের কণ্ঠে আজ তার তৈরি করা ‘তুই রাজাকার’ শব্দ। লাকীর সঙ্গে আমরা আবার বলে উঠি, গ-তে গোলাম আযম, তুই রাজাকার তুই রাজাকার।

বেলা পড়ে যাচ্ছে। মানুষের কমতি নেই। মানুষ যেন বেড়েই চলেছে। আমার খুব খিদেও পায়। জব্বার হুট করেই প্রশ্ন করে, দোস্তো খিদা লাগছে? চলো খাইয়া আবার আসি। আমার হোটেলটাও দেইখা আসবা।

জব্বারের সঙ্গে টিএসসি থেকে রিক্সা নিয়ে রওনা দেই লালবাগ। সেখানেই জব্বারদের হোটেল। বিরিয়ানি হাউজ। অনেক বছর পর এ এলাকায় আসলাম। সব যেন পাল্টে গেছে। আগের মতো কিছুই নেই। ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানগুলো বড় বড় বিল্ডিং করে সব দখল করে নিয়েছে। চেনা জানা লালবাড় এখন বড় অচেনা। বিরিয়ানি হাউজ নেমে আরও চমকে যাই। আধুনিকতার ছোঁয়া এ হোটেলেও লেগেছে। ময়লা ফ্যানের বদলে লেগেছে এসি। ছেড়া নোংরা জামাকাপড় পরা হোটেল বয়গুলোর শরীরে এখন হোটেলের নির্ধারিত জামা। কালো শার্ট, নীল প্যান্ট। বুকের বাম পাশে নেইম-প্লেটও আছে। ক্যাশে দেখি জব্বারের বাবা বসা। ঠিক আগের মতই বসে আছেন। বয়স থাকে আঘাত করেছে। দাড়িতে পাক, চুলে পাক ধরেছে।

জব্বার আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলে তিনি ক্যাশ কাউন্টার থেকে বের হয়ে এসে জড়িয়ে ধরলেন। দেখি হাত কাঁপছে। তিনি আমাকে চিনতে পারেননি। কিন্তু আমি যখন বললাম, চাচা আপনার হোটেলে আগে কত বিরিয়ানি খেয়েছি। আপনি কত যত্ন করে খাইয়েছেন।

এটা শুনেই তিনি বের হয়ে আসেন। বলেন, আহারে আমার ওইসব বাবারা তো কেউ আসে না। তুমি আসছো। বুড়া চাচার হোটেলে তোমরা আসো না কেন।

কেন যেন খুব অপরাধবোধ হচ্ছিল। এ মানুষগুলো এমন কেন? কিসের এতো আবেগ? কিসের এতো আপন আপন ভাব? কেন? আমাকে আপন করে ওনার লাভ কি? আমার জন্য ওনার কেন এতো ভালোবাসা? মানুষ এমন কেন? আমি শুধু কাজের পেছনে ছুটি। একগাদা শিক্ষিত অশ্লিল কু-রুচিপূর্ণ মানুষের সঙ্গে চাকরি করতে হয়। তাদের ভালো ব্যবহারের ভেতর, ভালোবাসার ভেতর কোথায় যেন স্বার্থ লুকিয়ে থাকে। তারপরও তাদের সঙ্গেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা দিনের পর দিন পার করে দেই। সমাজিকতা আমরা শুধু সেইসব স্বার্থপর মানুষের সঙ্গেই রক্ষা করি। অথচ এই যে আবেগী সরল মনের মানুষগুলো। এদের আমরা খুঁজেও দেখি না। তাদের সঙ্গে আলাপ করারও সময় আমাদের হাতে নেই।

(চলবে…)