গোলাম একটি বিস্ময়!

হুট করেই কি যেন হলো! তুরস্ক রাষ্ট্রপতি কেন নড়াচড়া শুরু করলেন সেটাও মাথায় ঢুকলো না। তিনি কেন গোলাম আযমের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে মানা করলেন সেটাই এখন ভাবনার বিষয়। তবে আমার লেখার বিষয় তুরস্ক না। আমার বিষয় মিস্টার গোলাম আযম। তার বিচার প্রক্রিয়া চলছে। যদিও ৭১ সালে কাউরে হত্যা করতে তিনি কোনো প্রক্রিয়া চালিয়েছিলেন কিনা কে জানে!

শিরোনামটা দৈনিক সংগ্রাম থেকে নেওয়া। তারা‌ পত্রিকায় একবার উল্লেখ করে, ‘আল বদর একটি নাম। একটি বিস্ময়! আল বদর একটি প্রতিজ্ঞা যেখানেই দুষ্কৃতকারী আল বদর সেখানেই। ভারতীয় চর কিংবা দুষ্কৃতকারীদের কাছে আল বদর সাক্ষাৎ আজরাইল’।

তাই আল বদর নেতা গোলাম আযম অবশ্যই একটা বিস্ময়! এই বুড়া বয়সেও তারে নিয়া বিশ্ববাসী চিন্তিত। বিরোধীদল চিন্তিত। একটা রাজাকার নিয়া তরুস্কের রাষ্ট্রপতিও চিন্তিত। যাইহোক, লেখায় চলে যাই…

শুরুতেই তার পরিচয় দেয়া দরকার।

হু ইজ গোলাম আযম?

মিস্টার আযম ৭১ সালে পাকিস্তান বাহিনীকে বাঙালি নিধনে সহায়তা করেছেন। জামায়াতে ইসলামীর আমির পদ থেকে পদত্যাগ করে পরে অবসের যান। তিনি রাজাকার নামে পরিচিত। যদিও সম্প্রতি তার নামের পাশে অধ্যাপক শব্দটিও দেখতে পাই। দেখে বড় ব্যাথাও পাই। অধ্যাপকদের এজন্য আন্দোলন করা উচিত বলে মনে হচ্ছে।

বিভিন্ন সময়ে তার বিবৃতি:

দৈনিক সংগ্রাম (৮ এপ্রিল):

গোলাম আযম, মাওলানা নূরুজ্জামান ও গোলাম সারওয়ার এক যুক্ত বিবৃতি দেন।

বিবৃতির অংশবিশেষ:

ভারত ও পূর্ব পাকিস্তানের অভ্যন্তরীন ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করেছে। ভারতীয় বা পাকিস্তান বিরোধী এজেন্টদের বা অনুপ্রবেশকারীদের যেখানেই দেখা যাবে, সেখানেই পূর্ব পাকিস্তানের দেশপ্রেমিকরা তাদের নিমূর্ল করবে।

৯ এপ্রিল:

এই দিনে রেডিও পাকিস্তান থেকে তার একটি বেতার ভাষণ প্রচারিত হয়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ভারতীয় লোকসভায় বাংলাদেশের শরণার্থীদের সাহায্য দেওয়ার আশ্বাসের প্রসঙ্গে মিস্টার আযম বলেন,

ভারতের প্রধানমন্ত্রীর মত দায়িত্বশীল ব্যক্তি পূর্ব পাকিস্তানিদের প্রতি যে সমর্থন ও সমবেদনা জানিয়েছেন, তাতে আমি বিস্মিত হয়েছি।

মুক্তিযোদ্ধাদের সম্পর্কে তিনি বলেন, পূর্ব পাকিস্তানে সশস্ত্র অনুপ্রবেশকারী পাঠিয়ে ভারত প্রকৃতপক্ষে আমাদের দেশপ্রেমের মূলে আঘাত হেনেছে। এ ধরনের অনুপ্রবেশ এ প্রদেশের মুসলমানদের কোন কাজেই আসবে না।

১৩ এপ্রিল:

শান্তি কমিটি সেদিন বায়তুল মোকাররম থেকে মিছিল বের করে। মিছিলের উপস্থিত ছিলেন গোলাম আযম। মিছিল শেষে মোনাজাত পরিচালিত হয়। মোনাজাতের দায়িত্বে ছিলেন গোলাম আযম। তিনি আল্লাহর কাছে প্রার্থণা করেন। বলেন,

পাকিস্তানের সংহতি ও অশেষ ত্যাগ তিতিক্ষার মাধ্যমে অর্জিত পাকিস্তানের বুনিয়াদ যেন অটুট থাকে।

মোনাজাত শেষে মিছিলকারীরা সংহতি রক্ষায় নিয়জিত হয়। তারা আজিমপুর কলোনি, শাখারীবাজার, শান্তিনগরে বাঙালিদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়। এবং বেশ কয়েকজন বাঙালিকে হত্যা করে রাস্তায় ফেলে রাখে।

২০ জুন:

গোলাম আযম লাহোরে এক সম্মেলনে বলেন, পূর্ব পাকিস্তানে অধিক সংখ্যক অমুসলমানদের সহায়তায় শেখ মুজিবুর রহমানের হয়তো বিচ্ছিন্নতার ইচ্ছা থাকতে পারে, তবে তিনি প্রকাশ্যে কখনও স্বাধীনতার জন্য চিৎকার করেননি। অবশ্য তার ছয় দফা স্বাধীনতাকে সম্ভব করে তুলতে পারত বলে তিনি উল্লেখ করেন। মাওলানা ভাসানী, অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ, আতাউর রহমান খান এরাই মূলত প্রকাশ্যে বিচ্ছিন্নতার দাবি তোলেন। বিচ্ছিন্নতার জন্য শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিন্তু যারা প্রকাশ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন শুরু করেছিলেন তাদের তো গ্রেপ্তার করা হয়নি। সেনাবাহীনি পূর্ব পাকিস্তানে প্রায় সব দুস্কৃতকারীকে উৎখাত করেছে এবং বর্তমানে এমন কোনো শক্তি নেই যে সেনাবাহিনীর প্রাধান্যকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে।

১৪ আগস্ট:

আজাদি দিবসে কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে এক সভার আয়োজন করে। ওই সভায় তিনি ‘পাকিস্তানের দুশমনদের মহল্লায় মহল্লায় তন্ন তন্ন করে খুজে তাদের অস্তিত্ব বিলোপ করা জন্য’ দেশপ্রেমিক নাগরিকদের শান্তি কমিটির সঙ্গে সহযোগিতা করার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানান।

তিনি আরও বলেন, আল্লাহ না করুন, যদি পাকিস্তান না থাকে তাহলে বাঙালি মুসলমানদের অপমানে মৃত্যু বরণ করতে হবে।

স্বাধীনতাকামী বাঙালিদের সম্পর্কে বলেন, কিন্তু এবার পাকিস্তানের ভেতরে হাজারো দুশমন সৃষ্টি হয়েছে। তাই এবারের সংকট কঠিন। কারণ বাইরের দুশমনে চেয়ে ঘরে ঘরে যে সব দুশমন রয়েছে তারা অনেক বেশি বিপদজনক।

১৮ আগস্ট:

দৈনিক সংগ্রামে তিনি এদিন একটি উপসম্পাদকীয় লেখেন।

হিন্দুদের সাথে এক জাতি হয়ে এবং হিন্দুভারতকে বন্ধু মনে করে অদূরদর্শী কতক মুসলিম নেতা বাঙালি মুসলমানদেরকে সর্বক্ষেত্রে বহু পেছনে ঠেলে দিয়েছে। এর ধাক্কা সামলিয়ে বাঙালি মুসলমানকে আবার অগ্রগতি লাভ করতে হলে মুসলিম জাতীয়তাবোধকেই জাগ্রত করতে হবে। আসুন, আমরা অতীতের ভ্রান্তি থেকে মুক্ত হয়ে ওই প্রতিশ্রুতি বাস্তবে রূপ দান করার দৃঢ় শপথ গ্রহণের মাধ্যমে সত্যিকারভাবে আজাদী দিবস পালন করি।

দুনিয়ার প্রত্যোক রাষ্ট্র নামই স্থান, ভাষা, জাতি বা ঐতিহাসিক কোন নাম থেকে নেয়া। কিন্তু পাকিস্তানের নাম এ ব্যাপারে ব্যতিক্রম। এ নাম যা বিশেষ একটি উদ্দেশ্যের প্রতি সুসম্পর্ক ইঙ্গিত দান করে। এ নামের অর্থ হলো পবিত্র স্থান।

২৯ আগস্ট:

করাচি সফরের সময় লাহোরের সাপ্তাহিক জিন্দেগিতে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন,

২৫ মার্চের পর পাকিস্তানী সেনাবাহিনী যে পদক্ষেপ গ্রহণ করে তা ছিল এদেশের মাটি রক্ষার জন্য, এর আগেই অরুরূপ পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন ছিল না কি? সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আমি আশঙ্কা করছি, যেখানে সেনাবাহিনী এবং রাজাকার বাহিনী নেই, সেখানে অংশগ্রহণকারীদের দুস্কৃতকারীরা হত্যা করবে, তাদের বাড়ি লুট করবে ও জ্বালিয়ে দেবে। …

১৯৭১ সালে তিনি সর্বশেষ বক্তব্য দেন ২৭ নভেম্বর। সেদিন তিনি বলেন, কোন জাতি যুদ্ধকালে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা ছাড়াই টিকতে পেরেছে, এমন কোন নজির ইতিহাসে খুজে পাওয়া যাবে না। আত্মরক্ষা নয় আক্রমণই এখন সর্বোত্তম পস্থা।

এসব বক্তব্য গোলাম আযমকে পাকিস্তানের উৎকৃষ্ট ‘গোলাম’ হিসেবেই প্রমাণ করে। তিনি বাংলাদেশকে চাননি, বাংলাদেশের স্বাধীনতা চাননি সেটা তো প্রমাণিত। বিশ্বের কাছে আর কত প্রমাণ দরকার কে জানে!