টাইমের বিস্ময়ে টিম কুক

এ বছর টাইম ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে জায়গা করে নিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। টাইম ম্যাগাজিনের নির্বাচনে তিনি হলেন ‘পারসন অব দ্য ইয়ার’। তাকে বলা হচ্ছে, নব্য আমেরিকার স্থপতি। তবে টাইম ম্যাগাজিনের পারসন অব দ্য ইয়ার না হয়েও রানারআপ হয়েছেন এ সময়ের টেক জায়েন্ট প্রতিষ্ঠান অ্যাপলের প্রধান নির্বাহী টিম কুক।

স্টিভ জবসের উত্তরসূরি টিম কুক স্বভাবে খুবই সাধারণ। অনেকেই বলেন, স্টিভ জবসের মতই চুপচাপ থাকেন কুক। দুজনের মধ্যে মিলও আছে অনেক। এ জন্যই হয়ত স্টিভের চলে যাওয়ার পরও এক মুহূর্তের জন্যও থেমে নেই অ্যাপেল।

অফিসে প্রতিটি বিষয়ে তিনি অত্যন্ত অস্থির। কোনো বিষয়ে দেরি করা একদমই পছন্দ না। এই তো কিছুদিন আগেই চীনে আইফোনজনিত সমস্যায় বিপাকে পড়ে অ্যাপেল। এ খবর পাওয়া মাত্রই জরুরি বৈঠক ডাকেন কুক। সিদ্ধান্তও হয় চটজলদি। অফিসের একজন নির্বাহী কর্মকর্তা উড়ে যাবেন চীনে। সমস্যার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত সেখানেই অবস্থান করলেন।

সিদ্ধান্ত হওয়ার পর কুক নিজের অফিস কক্ষে গিয়ে বসেন। তার প্রায় ৩০ মিনিট পর তিনি বের হলেন। দেখলেন যে কর্মকর্তাকে চীনে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে তিনি তখনও অফিসে। কুক সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার করে উঠলেন। বললেন, তুমি এখনও এখানে কি করছো? তোমাকে না বললাম চীনে যেতে?

এ কর্মকর্তা তখনই ছুটে গেল ভিসা অফিসে। ভিসা নিয়ে সরাসরি প্লেনে। সংবাদমাধ্যম থেকে জানা যায়, এ কর্মকর্তা এতই ভয় এবং অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছিলেন যে তিনি অফিসের জামা পরেই চীন চলে গেছেন। সঙ্গে কিছুই ছিল না।

কুক এমনই। অদ্ভূত। প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বসেও কুক নিজেকে বাইরের মনে করেন। তিনি মনে করেন, এ বিশ্বে কোনো কিছুই চিরস্থায়ী না। অ্যাপেল সম্পর্কে তার মতামত হলো, বিশ্বে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে দেখা যায় প্রধান নির্বাহীকে সরিয়ে ফেলা হয়। আমার কাছে ‘সরিয়ে দেওয়া’ শব্দটা মোটেও পছন্দ নয়। আমি চাই সব প্রতিষ্ঠান কর্মীদের বিদায় হতে হবে আনুষ্ঠানিক এবং সম্মানজনকভাবে।

স্টিভের বিষয়ে আমরা কমবেশি সবাই জানি। তাকে এক সময় প্রধান নির্বাহীর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। হয়ত এ জন্যই কুক কখনও সবকিছুকে আপন করে নিতে ভয় পান। স্টিভ জবসের গল্প খুব কষ্টের। অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে তিনি অ্যাপলের মতো প্রতিষ্ঠানে ব্যবসা সফল করে তোলেন।

কিন্তু টিম কুকের গল্পটাও কম কষ্টের না। কুকের জন্ম আমবালা শহরে। তার বাবা জাহাজের সাধারণ শ্রমিক ছিলেন।

কুক এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, আমি কাগজ তৈরি প্রতিষ্ঠানে সেই ছোটবেলাতেই কাজ করেছি। আপনারা যাকে শিশু শ্রমিক বলেন। আমি ছিলাম সেই শিশু শ্রমিক। স্টিভ জবস তো তাও মধ্যবিত্ত পরিবারের ছিলেন। কিন্তু কুক একদমই হতদরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা এক মানুষ।

দারিদ্র্যতা কখনও শিক্ষাকে আটকে রাখতে পারে না। প্রয়োজন প্রবল ইচ্ছাশক্তি। সে ইচ্ছা দিয়েই পড়াশোনায় নিজেকে মনোযোগী করে গড়ে তোলেন টিম কুক। তিনি আবার্ন ইউনিভার্সিটি থেকে ১৯৮২ সালে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়াশোনা শেষ করেন।

এরপরই যোগ দেন বিখ্যাত আইবিএম প্রতিষ্ঠানে। এখানে মেন্যুফেকচারিং এবং ডিসট্রিবিউশন বিভাগে নিজের যোগ্যতা প্রমাণে সফল হন। ধীরে ধীরে বিশ্বের প্রযুক্তির জায়েন্ট প্রতিষ্ঠানগুলোতে তার পরিচয় ছড়িয়ে যেতে থাকে। সুদীর্ঘ ১২ বছর পর তিনি আরেক প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান ‘কমপ্যাক’ জয়েন করেন। এখানে ১৯৯৭ সালে কাজ শুরু করেন করপোরেট ম্যাটেরিয়ালস বিভগের সহসভাপতি হিসেবে।

এরপরের গল্পটা পুরোটাই কাকতালীয়। স্টিভ জবসকে ১৯৮৫ সালে অ্যাপল থেকে বের করে দেওয়া হয়। এরপর আবারও নিজের যোগ্যতায় ফিরলেন অ্যাপলে। নিজের ফিরে পাওয়া দায়িত্বে বসেই ফোন দিলেন টিম কুককে। এ সময় অ্যাপেলের অবস্থা খুবই নাজুক। কোটি কোটি ডলার ক্ষতির মুখে অ্যাপল। কোনোভাবেই প্রযুক্তিজগতে ঘুড়ে দাঁড়াতে পারছে না অ্যাপল।

এ সময় স্টিভ এমন একজন মানুষকে পাশে চাইলেন যিনি এ প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় সহযোগিতা করবেন। ঠিক তখনই স্টিভের নজরে আসেন কুক। তখন সবে কুক কমপ্যাকে কাজ শুরু করেছেন। তাই স্টিভের কথায় অ্যাপেলে আসতে খুব একটা আগ্রহী ছিলেন না। তিনি প্রথমে স্টিভকে ‘না’ বলে দিলেন।

তবে স্টিভও নাছোড়বান্দা। তিনি যা করতে চান, তা তিনি করেই দেখানোর মানুষ। আবার একদিন ফোন দিলেন কুককে। বললেন, আমি আপনার সঙ্গে বিকালে চা খেতে চাই। যদি আপনার সম্মতি থাকে।

এ প্রসঙ্গে কুক একবার বলেছিলেন, যদিও স্টিভকে আমি মানা করে দিয়েছিলাম। কিন্তু তার প্রতি আমার অসম্ভব আগ্রহ ছিল। আমি চায়ের দাওয়াত পেয়ে খুশি হয়ে গিয়েছিলাম। তার সঙ্গে দেখা হওয়ার সময়টায় আমি প্রচন্ড উত্তেজনায় ছিলাম।

এরপর দুজনের চায়ের আড্ডা হলো। ‌এ আড্ডা সম্পর্কেও কুক এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, তার সঙ্গে কথা হওয়ার পাঁচ মিনিটের মধ্যেই আবিষ্কার করলাম এ লোকটার ভেতর জাদুমোহ করার ক্ষমতা আছে। নিজের অজান্তেই বলে ফেললাম, আমি আপনার সঙ্গে কাজ করতে চাই। আমার মনে হতে থাকল, যদি আমি তার সঙ্গে কাজ করতে না পারি, তবে সারাজীবন অসীম শূন্যতায় ভুগবো।

এরপর তো ইতিহাস। কুক দেখেছেন স্টিভের বিশ্বজয়। কুক একবার বলেছিলেন, যখন বিশ্ব প্রযুক্তিব্যবসায় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে। ঠিক এ সময় দাপটের সঙ্গে স্টিভ অ্যাপেলকে নিয়ে গেছেন অদম্য উচ্চতায়।

এ বছরই টিম কুক প্রধান নির্বাহী হিসেবে তার পূর্ণ বার্ষিক ক্যালেন্ডার শেষ করল। এমন সময়ে টাইম ম্যাগাজিনের নজরে আসাটা অনেকটাই নিশ্চিত ছিল। কারণ চীনে ঘটে যাওয়া সমস্যাকে খুব চমৎকারভাবেই সামাল দিয়েছেন কুক।

এবারে আসা যাক টিম কুকের প্রত্যাহিক জীবনে। তার আগে বলে নেওয়া ভালো, কুক কখনও স্টিভ জবসের মতো হতে চাননি। তিনি বরাবরই বলেছেন, আমার নাম টিম কুক। আমি কারও মতো না। তিনি আরও বলেন, ঠিক ১ সেকেন্ড পরে কি হবে তা আমি জানি না। তবে নিশ্চিত করে বলতে পারি, আমি যা করবো মঙ্গলের জন্যই করবো।

কুক প্রচন্ড কাজ পাগল মানুষ। তিনি ভোর ৩টা ৪৫ মিনিটে ঘুম থেকে ওঠেন। উঠেই ইমেইল চেক করেন। তারপর হাঁটেন। জিমে যান। তারপর অফিসে চলে যান। নিজের কাজের প্রসঙ্গে তরুণদের উদ্দেশ্যে একবার কুক বলেছিলেন, তুমি যে কাজটাকে ভালোবাসো সেটাই করো।

কারণ ভালোবাসার কাজটা তোমার কাছে কখনই কাজ বলে বিবেচিত হবে না। আমি খুব সৌভাগ্যবান যে ভালোবাসার কাজটি খুঁজে পেয়েছি। তোমরাও খুঁজতে থাকো। একদিন ঠিকই পেয়ে যাবে। তখন কাজ আর কাজ মনে হবে না। কাজটা খেলার মতিই উপভোগ্য হয়ে উঠবে।