গল্প: সর্প ভাইয়ের গল্প

আজকে সর্প ভাই আসবে। আপনারা আবার সর্পকে সাপ ভাববেন না। সর্প ভাই আমাদের অতি পছন্দের বড় ভাই। তিনি এখন টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিতে পিএইচডি করছেন। তাহলে বোঝেন! কতটা মেধাবী আমাদের সর্প ভাই। তার আগে সর্প নামটার ব্যাখ্যা দেয়া প্রয়োজন। ওনার নাম আসলে সরফোরাজ পাটোয়ারী। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকে সবাই তাকে সর্প ভাই নামেই ডাকে। তাই আমরাও সর্প ভাই ডাকি। এটা তো আর আমাদের দেয়া নাম না। কে দিয়েছে কে জানে!

মাঝে মাঝে সর্প ভাইকে আমরা রাজ ভাই বলেও ডাকতাম। তখন তিনি চিৎকার করে উঠতেন। বলতেন, কি সব আউলা নামে ডাকিস! তোদের কাছে আমি সর্প। সাপ। তোদের সঙ্গে থাকবো কিন্তু ছোবল দেব না।

এই বলে দিতেন এক হাসি। আমরাও হাসতাম। সর্প ভাই গণিত বিভাগের মেধাবী ছাত্রদের অন্যতম ছিলেন। কিন্তু কেন তিনি মেধাবী কিংবা কীভাবে মেধাবী তা মোটেও বুঝতে পারতাম না। ক্লাসের সময়ের বাইরে তিনি হয় টিউশনি করতেন; না হয় হলে বসে বসে তাস পেটাতেন। এমনও দিন গেছে যে বিকেলে তাস খেলতে বসে পরের দিন সকালে খেলা থেকে উঠে তিনি ক্লাসে গেছেন। আমরা তো পড়াশোনার ধার ধারতাম না। সর্প ভাই যখন ক্লাসে দৌঁড় দিতেন আমরা তখন বিছানায় শরীর এলিয়ে ঘুমাতাম।

আমাদের ক্লাস মিস দেওয়া নিয়ে সর্প ভাই সবসময় খেপে যেত। সবসময় বলত, তোরা ক্লাস কেন মিস করবি? ক্লাস করবি। পড়াশোনা যা হয় ক্লাসেই হয়। এইসব নোংরা হলে বসে পড়া হয় নাকি? ময়লা আবর্জনা ভরা হল।

আমরা হাসতাম। এই ময়লাতে শুয়ে শুয়েই যে সবাই দিনের পর দিন পার করছে! কই?  কেউ তো কিছুই বলে না। তবে সর্প ভাই মাঝে মাঝে বিপ্লবী হয়ে উঠতো। একবার বায়োলজি ডিপার্টমেন্টের শহীদুল নামে এক ছেলের ডায়রিয়া হয়ে হাসপাতালে ছিল ১০ দিন। কারণ ছিল দুইটা। একটা হলো, বিশুদ্ধ পানির অভাব। আর দ্বিতীয়ত ছিল, অস্বাস্থ্যকর টয়লেট। হলের টয়লেটের কথা মনে হলে এখনো আমার শরীর ঘিনঘিন করে ওঠে। কি ভয়াবহ। সে বর্ণনা এখন দিতে গেলে আপনারা আমার গল্প পড়া বাদ দিয়ে বোমি করা শুরু করবেন। তাই বলবো না।

তো, সেই শহীদুলের ঘটনার পর সর্প ভাই প্রচন্ড খেপলেন। সবাইকে ডেকে বলল, শালার আমরা কি এখানে বাস্তুহারা নাকি? নোংরা অপরিস্কার জায়গায় থেকে পড়াশোনা করবো কেন? শহীদুল তো মরেই যেত। চল আন্দোলন করি। সবগুলো হলের টয়লেট যেন ঠিক করা হয় এ নিয়ে হবে আন্দোলন।

সর্প ভাই ডেকেছেন আর আমরা যাবো না? সবাই মিলে লোকজন জোগাড় করতে শুরু করলাম। এবিষয়ে সবাই একমত। সব হলের আমাদের বন্ধুদের বললাম। একদিন একজন রাজনৈতিক দলের নেতা এসে বললেন, তোমাদের সঙ্গে আমরাও একমত। আন্দোলনে আমরা আছি।

এই শুনে আমরা তো খুশী! রাজনৈতিক ছাত্রদের সাহায্য পেলে এ আন্দোলন জোরদার হবে। আসলেই তাই। আমরা জোরসে শুরু করলাম টয়লেট আন্দোলন। প্রথম যেদিন আমরা মিছিল করে প্রক্টোর বরাবর যাবো ঠিক সেই সময় রাজনৈতিক কিছু ব্যানার দেখে সর্প ভাই খেপে গেল। সর্প ভাই সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ডাকলেন। বললেন, এখানে রাজনীতি ঢুকলো কীভাবে? আমরা বললাম, বড় ভাইরা বলল আমাদের সঙ্গে তারা একমত। তাই আমরা সায় দিয়েছি।

সর্প ভাই খেপে বুম!

এই যে তোদের জন্য আজ দেশটার এই দশা। রাজনীতির সাপোর্ট পেলে সুবিধা হবে। এই চিন্তা করেই দেশের সব প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস হচ্ছে। তোদের মত সুবিধাবাদীদের জন্যই এই বদগুলো সুযোগ পায়।

আমাদের তখন খুব রাগ হলো। আমরাও বললাম, সর্প ভাই, ওনারাও তো ছাত্র। ওনারা সাপোর্ট করলে তো সমস্যা হওয়ার কথা না। তাদেরও তো দাবী থাকতে পারে। সর্প ভাই বললেন, অবশ্যই না। তারা বিপক্ষ দলকে ঘায়েল করার জন্য  আমাদের ব্যবহার করবে। তোরা ব্যানারগুলো দেখছিস না? স্লোগানগুলো দেখ। কি লেখা? তাদের রাজনৈতিক দর্শনের স্লোগান। এখন আমাদের ঘাড়ে বন্দুক রেখে তারা বিপক্ষ দলকে খোঁচা দেবে। একটু পরেই দেখবি, অন্য দল লাঠি সোটা নিয়ে আমাদের উপরই ঝাপিয়ে পড়বে। মার খাবো আমরা। তখন ফয়দাটা লুটবে এরাই। বলবে, সরকারী ছাত্র রাজনৈতিক পোলাপান বিরোধী দলের পোলাপানরে আহত করছে। তোর-আমার পিঠে তখন আর সাধারণ ছাত্র’র সিল থাকবে না। আমরা হয়ে যাবো কোনো এক রাজনীতিক দলের সদস্য। এটা তোরা বুঝিস না? বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িস অথচ বাচ্চা পোলাপানের মাথা। টয়লেটের অই নোংরা ঘু-মুতেও তো পুষ্টি আছে। আর তোদের মাথায় তার একবিন্দু পুষ্টি নাই। বলদগুলা।

শেষ দুটি লাইন শুনে সত্যিই আঘাত পেলাম। সর্প ভাই এভাবে আমাদের অপমান করলো? তারপরও যুক্তি ঠিক আছে। তাই সেদিন আমরা কৌশলে মিছিল করা বাদ দিলাম। এরপর কয়েকজন ছাত্র নিয়ে সর্প ভাই সহ প্রক্টোরের কাছে গিয়ে অভিযোগ করলাম।

প্রক্টোর কথা শুনেই হেসে উঠলেন। বললেন, দেশের এতো সমস্যা থাকতে আমাদের ছাত্ররা হাগা মুতা নিয়ে ভাবা শুরু করছে। কি ভবিষ্যত দেশের! একথাটা শুনে আমরা খুবই লজ্জা পেলাম। কথাটা স্যার ঠিকই বলেছেন। দেশের এতো সমস্যা। কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়েরও অনেক সমস্যা। আর আমরা কিনা টয়লেটের মত সাধারণ সমস্যা নিয়ে ভাবছি!

সর্প ভাই স্যারের কথা মানলেন না। তিনি সরাসরি বললেন, স্যার, এটাও দেশের জন্য একটা মহা সমস্যা। এখনো সারা বিশ্বে ৬০ ভাগেরও বেশি মানুষ স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন পদ্ধতির সুবিধা পাচ্ছে না। সারা বিশ্বে ১ বিলিয়নেরও বেশি শিশু শুধুমাত্র স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশনের অভাবে মারা যায়। আর এটি যদি সাধারণ সমস্যা হতো তাহলে আন্তর্জাতিক টয়লেট অরগানাইজেশনও গঠন হতো না। বিশ্ব ব্যাংক, ইউনিসেফ  স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন তৈরিতেও কোটি কোটি অর্থ ইনভেস্ট করতো তা। এটি স্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজন একটি বিষয়। সুতরাং এটিও একটি রাষ্ট্রীয় প্রধান সমস্যা।

স্যার চুপ করে শুনলেন। তারপর তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বললেন, বুঝলাম। তোমরা স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতন। তো, আমরাও তো সচেতন। তাই সুন্দর স্যানিটেশন পদ্ধতিও দিয়েছি। কিন্তু সেটা ব্যবহার করে কারা? আমরা নাকি তোমরা?  পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন করার দায়িত্ব কার? আমার নাকি তোমাদের? হাগবা তোমরা আর সাফ করবো আমরা এটাতো হতে পারে না! একটা টয়লেট তোমরা সাফ সুতরা করে রাখতে পারো না। তোমরা দেশকে কেমনে পরিস্কার রাখবা?

এই কথা শুনে আমরা সবাই চুপ। কিন্তু আমরা তখন সর্প ভাইয়ের জবাবের অপেক্ষায়। ঠিক কোন যুক্তি তিনি দাঁড় করাবেন। কিন্তু অবাক হয়ে দেখলাম, সর্প ভাই মাথা নিচু করে চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন। স্যারের দিকে উত্তরহীন চোখে তাকিয়ে কিছু একটা বলতে গিয়েও পারলেন না। ধীরে ধীরে বের হয়ে গেলেন। আমরা তখনও বসে আছি। স্যার আমাদেরকে বললেন, সো বয়েজ! ইউর লিডার ইজ আপসেট! তোমরাও যেতে পারো।

আমরা সেদিন বাইরে নিশ্চুপ বসে আছি। সর্প ভাইয়ের চুপ হয়ে যাওয়াটা আমাদের অপমান লেগেছে। হলের পাশে একটা টং দোকানে বসে সিগারেট ফুকছি। ধোঁয়ার বাতাসের সঙ্গে মিশে যাওয়া দেখছি। কিন্তু সর্প ভাইয়ের এমন আচরণ আমরা কেউ মেনে নিতে পারছি না। হুট করেই তখন দেখি সর্প ভাই রিক্সা থেকে নামলেন। সঙ্গে হারপিক, টয়লেট ব্রাশ, বালতি। আমরা তো দেখে অবাক। দৌড়ে গিয়ে বললাম, কী হলো সর্প ভাই?

সর্প ভাই বললেন, কি আবার? স্যার কি বলল? আমরা নাকি টয়লেট পরিস্কার করতে জানি না। স্যারকে আমি দেখিয়ে দেব, আমরা পারি। এবং সেটা খুব ভালো মতই পারি। আমরা দেশের ভবিষ্যত। এদেশটাকেও আমরাই পরিস্কার করবো। সেখানে টয়লেট তো সামান্য বিষয়। চল তোরা।

ওই সময়ে তুহিন বলে ওঠলো, কিন্তু সর্প ভাই আসল সমস্যা তো টাংকিতে। টয়লেটের সঙ্গে যে টাংকি আছে। সেটা ভর্তি হয়ে গেছে। সেটা তো আর আমরা পরিস্কার করতে পারবো না।

সর্প ভাই বললেন, ঠিকাছে তুহিন। তোকে আমি দায়িত্ব দিলাম এই সমাধান বের করতে। একটা সুইপার খুঁজে বের করবি। টাংকি পরিস্কার করাবি। এবং সেই কাজটা করতে যা টাকা দরকার সেটা হলের সবাইকে ম্যানেজ করে চাঁদা তুলবি। দেখা যাক তুইও দেশের কোনো কাজে আসতে পারিস কিনা।

তুহিন একটু মদন টাইপ ছেলে। এতো কিছু তার পারার কথা না। কিন্তু অবাক করার বিষয় ছিল যে তুহিন একবাক্যে রাজি হয়ে গেল। বলল, আমি পারবো।

এই বলে, আমরা গেলাম উপরে। একে একে আমাদের হলের সবগুলো টয়লেট পরিচ্ছন্নতার কাজ শুরু হয়ে গেল। আমরা পাচটি গ্রুপে ভাগ হয়ে কাজ শুরু করলাম। সর্প ভাই নাম দিল, ‘মিশন টয়লেট ক্লিনিং’। রাতের মধ্যে আমাদের মিশন সফল। তুহিনও তার কাজ করে ফেলেছে।

মজার বিষয় ছিল পরদিন থেকে অন্যসব হলে এ গল্পটি ছড়িয়ে গেল। এবং সব হলেই সাধারণ ছাত্ররা এভাবেই কাজ শুরু করলো।

সর্প ভাই সবগুলো টয়লেটে একটি কাগজ লাগিয়ে দিলেন। যেখানে লেখা, ‘আবার ফিরে এখানেই আসবেন। সুতরাং নিজ দায়িত্বে পরিস্কার রাখুন।’ পুরো ক্যাম্পাসে সর্প ভাইয়ের নতুন নাম ছড়ালো। সর্প ভাই পরিচিত হলেন, টয়লেট বিপ্লবী সর্প।

টয়লেট নিয়ে সর্প ভাই পুরো ক্যাম্পাসে জনপ্রিয় হলে গেল। বিপ্লবী চেতনায় এটা তার নতুন কোনো কাজ নয়। সবসময় কিছু একটা করা উচিত মানসিকতা সর্প ভাইয়ের থাকে। আমাদের কাছে তো এটি নতুন নয়।

এমনই ছিল সর্প ভাই। রাতারাতি সব কিছু বদলে দেয়া যায় না। কিন্তু আমরা বিশ্বাস করতাম সর্প ভাই যা করতে চান রাতারাতিই বদলে দেয়ার ক্ষমতা রাখেন।

সর্প ভাইয়ের এমন অনেক গল্প আছে। কিন্তু সব গল্প বলতে গেলে তো আপনারা বিরক্ত হয়ে পড়বেন। তাই দু-একটি বলছি আর কি!

২.

সর্প  ভাই গণিতের ছাত্র। আমরাও গণিতের ছাত্র। কিন্তু শুধু পড়ার জন্য পড়ছি। অন্যদিকে সর্প ভাই পড়ার জন্য পড়তেন না। সবসময় গণিত নিয়ে ভাবতেন। এদেশে ভবিষ্যতে গণিতবিদ থাকবে না। এটা তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন। তিনি বলতেন, দেখ, আজকাল কেউ গণিত নিয়ে দার্শনিক চিন্তায় মগ্ন হয় না। গণিত যে কত সুন্দর। কত অসাধারণ একটি বিষয় তা নিয়ে বর্তমান শিক্ষার্থীরাও ভাবে না। শিক্ষকরা তো নাই। সবাই শুধু পাস করতে চায়। ভাবে, পাস করলেই হবে। দার্শনিক গণিত দিয়ে কি হবে? গণিত জীবনের কোনো কাজেই আসবে না। অথচ দেখ বিশ্বকে গণিতবিদরাই বদলে দিয়েছে। গণিত যদি না থাকতো মহাকাশ নিয়ে কেউ ভাবতো? চাঁদেও তো মানুষ যেতে পারতো না। আলোর গতি আবিষ্কার হতো না। যদি আলোর গতি আবিষ্কার না হতো তাহলে চিন্তা কর এ পৃথিবী কত পিছিয়ে থাকতো!

আমরা মাঝে মাঝে গণিতবিদদের গল্প শুনতাম সর্প ভাইয়ের কাছে। তাদের মধ্যে থাকতো রামানুজন, লিউনার্দ অয়লার, কার্ল ফ্রেডরিক গাউস সহ আইনস্টাইন। এদের মধ্যে ফ্রেডরিক গাউসকে অসম্ভব রকম পছন্দ করতেন সর্প ভাই। আমরা প্রথম জানতে পারি জার্মানির ১০ মার্কের নোটে গাউসের ছবি আছে। শুনে আমরা বিস্মিত হয়েছিলাম। সব দেশে রাজনৈতিক নেতাদের ছবি নোটগুলোতে থাকে। কিন্তু একজন গণিতবিদকে একটি জাতি কি পরিমাণ ভালোবাসলে তাদের টাকার নোটে তার ছবি রাখতে পারে!

সর্প ভাই বলতেন, গাউস ছিলেন নিঃসঙ্গ একজন গণিতবিদ। তার গণিত প্রতিভা বোঝার মত মানুষ সে সময় জার্মানিতে ছিল না। তিনি আপন মনে কাজ করে যেতেন। তিনি দুই হাজার বছরের অসাধ্য একটি সমস্যার সমাধান করেছিলেন। তিনি রুলার ও কম্পাসের সাহায্যে সম-সতেরোভুজ আঁকেন। অশিক্ষিত পরিবার থেকে উঠে আসা গাউস একের পর আবিষ্কার গণিতের সৌন্দর্যকে বাড়িয়েই তুলেছিলেন। কিন্তু তিনি ছিলেন একা। জার্মানিতে একসময় বহু গণিতবিদ এসেছেন। কিন্তু কারও সঙ্গেই গাউস কাজ করতে পারেননি। কারণ একা একা কাজ করতে করতে তার একা থাকাটাই অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল।

এই অসামান্য মানুষটির কথা সর্প ভাই প্রায়ই বলতেন। একবার আইস্টাইনকে নিয়ে আড্ডা দিতে গিয়ে সর্প ভাইয়ের মাথায় ভিন্ন এক বুদ্ধি এলো।

আড্ডাটা শুরু হয়েছিল আইনস্টাইনের এক বক্তব্যকে নিয়ে। আইনস্টাইন এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রশিক্ষিত কুকুর তৈরি করে।

এই নিয়ে সর্প ভাই বললেন, চিন্তা করেছিস? কত বড় মর্মান্তিক সত্য তিনি বহু বছর আগেই বলে গেছেন? সত্যিই তো সেটাই হচ্ছে। জীবনের সঙ্গে মিশেল কিংবা চাহিদার কোনো শিক্ষা এ বিশ্বে কেউই গড়ে তুলতে পারেননি। তারপর বর্তমান সময়ে যদি তিনি এ কথা বলতেন তাহলে পৃথিবীজুড়ে শিক্ষকরা তো আন্দোলনে নেমে যেত। ভাগ্য ভালো ব্যাটা বহু আগেই মরে গেছে।

এই আলোচনার মোড় নিল ভালো ছাত্র খারাপ ছাত্রের দিকে। সর্প ভাই বলা শুরু করলো, দেখ আমাদের দেশে ছাত্র দুই প্রকার হয়ে গেছে। ভালো ছাত্র এবং দূর্বল ছাত্র। ভালোরাই সব সুযোগ পায়। কিন্তু দূর্বল ছাত্র; যারা কোনো মতে পাশ করে কিংবা ফেল করে তাদের নিয়ে কিন্তু কেউ ভাবে না। সুতরাং তাদের নিয়েই কিছু একটা করতে হবে।

সর্প ভাইয়ের নতুন উদ্যোগের নাম দিল, ‘দূর্বলরাও সবল’। সর্প ভাই বললেন, তোরা ফার্স্ট ইয়ার থেকে থার্ড ইয়ার পর্যন্ত যত দূর্বল ছাত্র আছে তাদের লিস্ট বানা। তাদের সবাইকে আমি পড়াবো। ফ্রি। গণিতে মাস্টার বানায়া ছাড়বো সবগুলারে।

আমরাও সব নেমে পড়লাম। মহা আনন্দে লিস্ট বানালাম। দূর্বলরা কি আর মানতে চায় দূর্বলতার কথা! তাদের কনভিন্স করতে হলো। অনেকে সর্প ভাই পড়াবে শুনেই রাজি হলো। আবার অনেক ফাঁকিবাজকে চাপাবাজি করে রাজি করানো হলো। ফাইনাল লিস্ট হওয়ার পর এবার টাইম শিডিউল তৈরি করার পালা। এ কাজটা সর্প ভাই নিজেই করলেন। যেদিন থেকে ক্লাস শুরু হবে তার ঠিক আগের দিন সর্প ভাই আমাকে ডেকে পাঠালেন। আমি গেলাম তার রুমে। তিনি বললেন, তুই তো লিস্টটা বানিয়েছিস তাই না? আমি বললাম, জ্বি সর্প ভাই।

সর্প ভাই বললেন, গুড। কিন্তু এখানে একটা নাম মিসিং। আমি তোর অনুমতি নিয়ে সেটা অ্যাড করতে চাই।

আমি তো অবাক। বলে কি! কারও নাম ঢুকাতে আমার অনুমতি কেন লাগবে? আমি বললাম, কি বলেন সর্প ভাই। আপনের যাকে খুশী তাকে অ্যাড করেন। আমার অনুমতি কেন লাগবে?

সর্প ভাই জোরে নামটি বললেন। নামটি শুনে অপমানিত হলেও আমার কিছুই বলার ছিল না। দাঁড়িয়ে ছিলাম। প্রিয় পাঠক, আপনাদের নিশ্চয়ই বুঝাতে হবে না যে ওই নামটি আমার ছিল।

যাইহোক, সর্প ভাইয়ের সেই উদ্যোগ মহা সফল হলো। মাঠে বসে তিনি ক্লাস নিতেন। এবং ক্লাসের কোনো টপিক নিয়েই তিনি কথা বলতেন না। বলতেন গণিতের দর্শন নিয়ে। কারণ, সর্প ভাই মনে করতেন, যে কোনো কিছুতে ভালো করতে হলে আগে আগ্রহ তৈরি করা জরুরী। আর সেটা একমাত্র সম্ভব দর্শন দিয়ে। আগ্রহী করে তোলার জন্য তিনি গল্প বলতেন। গণিতের কত অজানা গল্প যে আমরা শিখেছি সর্প ভাইয়ের সেই সব লেকচার থেকে!

প্রত্যেকেই এরপর পরীক্ষায় ভালো করার চেষ্টা করা শুরু করলো। কিন্তু সর্প ভাই এতে মোটেও খুশী হলেন না। তিনি একদিন আমাদেরকে বললেন, সবাই পরীক্ষা নিয়ে চিন্তা করে। আমি তো পরীক্ষায় পাশ করার জন্য পড়াইনি। আমি তাদের মধ্যে গণিত নিয়ে ভাবনার সূত্রপাত করাতে পড়াতে চেয়েছি। নাহ্! মিশন ফেইল করেছে। ফেইল মিশন আমি কনটিনিউ করবো না।

আমরা সবাই হতাশ হলাম। আমরা বোঝাতে থাকলাম। যে আল্টিমেট কাজ হচ্ছে পরীক্ষায় ভালো নাম্বার পাওয়া। সেটা তো আমাদের ভুল দাবি না। নিজেকে প্রমাণ করতে হলে পরীক্ষায় ভালো নাম্বর পেতে হবে। সর্প ভাই তখন বললেন, তোদের নিয়ে এই এক সমস্যা। ভালো নাম্বর দিয়ে কি হবে? কত ভালো নাম্বর পাবি? ১০০ তে ১০০ পাবি? তা তো পাবি না। পাবি হচ্ছে ১০০ তে ৫০। সেকেন্ড ক্লাস পেয়ে লাফাবি। এই তোদের জন্যই দেশটা এগুতে পারে না। তোরা হইলি সেই মধ্যবিত্ত যাদের কোনো লক্ষ্য নাই। যারা অত্যাধিক ভালো। তারা জানে তাদের ভবিষ্যত কোথায়। ১০০ তে ১০০ পেয়ে জীবনে অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারবে। সামনে পড়তেও পারবে। চাকরি করলেও ভাওতা বাজি দিয়ে পার পাবে। আর যারা খারাপ তারাও জানে তাদের ভবিষ্যত অনুজ্জ্বল। তাদের দিয়ে কিছুই হবে না। তাই কিছু একটা তো করে খেতে হবে। মানসিকভাবে তারা প্রস্তুত থাকে। সার্ভাইভ করার একটা পথ তারা খুঁজতে থাকে। আর তোরা মধ্যবিত্ত কুকুরগুলো কিছুই জানিস না। তোদের কপালে কি আছে তা খোদ ঈশ্বরও জানেন না। বয়সকালে ভাবের সঙ্গে বলবি, কপাল যেদিকে নিয়েছে সেদিকেই গিয়েছি। তোদের কপাল কুত্তার কপাল। আজ এই ডাস্টবিনে মুখ দিবি তো কাল আরেক ডাস্টবিনে।

এতো কঠিন কথা সর্প ভাই নতুন বলেননি। কিছু হলেই অপমান করে দেবে। কিন্তু তারপরও সর্প ভাই আমাদের পছন্দের। বিপ্লব করে ফেলতে পারেন সর্প ভাই। আমরা এমনটাই বিশ্বাস করি। সর্প ভাই চাইলে একটি বিশ্ববিদ্যালয় কেন পুরো দেশকে বদলে দিতে পারে। আমাদের প্রিয় সর্প ভাই এমনই একজন মানুষ।

৩.

মাস্টার্ষ শেষ করে সর্প ভাই শিক্ষকতা শুরু করেন। সেটাও অভিমান করে। গণিত বিভাগের সেরা ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও তিনি নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাননি। কারণ, তার কোনো রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড ছিল না। শিক্ষকদের তেল মেরে চলার অভ্যাসও ছিল না। তাই নিয়োগ পাননি। এই অভিমানে তিনি একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিতের শিক্ষক হিসেবে পড়ানো শুরু করেন।

আমরা তখন ফাইনাল ইয়ারে। সর্প ভাইকে বলতাম, আমাদের জন্য লাইন ক্লিয়ার রাইখেন সর্প ভাই।

সর্প ভাই আবার আমাদের অপমান করে বলতেন, লাইন ক্লিয়ার রাখবো? শিক্ষক হবি? তোরা হবি শিক্ষক? অবশ্য তোদের মতো টাউটগুলাই শিক্ষক হচ্ছে। তাই তো দেশের এই অবস্থা।

সর্প ভাইয়ের অপমানও ভালো লাগতো। সরাসরি সত্যি কথা মুখের উপর ছুঁড়ে দেন। অপমান করলেও আমাদের প্রতি তার ¯েœহ কম ছিল না। সে গল্প বলতে গেলে শেষ হবে না। শুধু এতটুকুই বলি, আমাদের এক বন্ধু ছিল। তার নাম রমজান। কৃষক পরিবারের ছেলে ছিল। তার বাবার দুটি কিডনি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। রমজান প্রতিদিন কাঁদতো। একদিন সর্প ভাই বলল, রমজান কাঁদিস কেন? তোর বাপেরে আমি কিডনি দিয়া দিমু। কাঁদিস না।

কি ছিল সর্প ভাইয়ের কথায় কে জানে। সেদিনই তিনি খবর পেলেন তার বাবা মারা গেছেন। তিনি গ্রামে চলে গেলেন। রাতেই দেখি সর্প ভাই হলে হাজির। এসেই রমজানকে নিয়ে বের হয়ে গেলেন। আমরা তখন কিছুই বুঝতে পারলাম না। পরদিন শুনি, সর্প ভাইয়ের বাবার দুটি কিডনি রমজানের বাবাকে দান করেছেন। এবং এই অপারেশনের জন্য টাকা দরকার। তাই সর্প ভাই আবার গ্রামে গেছেন তাদের কিছু জমি জমা বিক্রি করতে।

এরপর  সর্প ভাই আমাদের কাছে ঈশ্বরের সমুতূল্য হয়ে গেলেন।  একজন মানুষের কতটা মানসিক ক্ষমতা থাকলে এই কাজটি করতে পারেন! আমার জানে মতে তো এমন ঘটনা শুনিনি। কিন্তু চোখের সামনে সর্প ভাইকে রমজামের পাশে থেকে সব সাহায্য করতে দেখেছি। ভাগ্য ভালো যে কিডনি প্লেট ম্যাচ করেছিল।

যাইহোক। রমজান তার বাবার অপারেশনের শেষে সর্প ভাইয়ের পায়ে পড়ে কেঁদে ফেলেছিল। তখনও সর্প ভাই কঠোর। তিনি বললেন, রমজান, তুই যখন অনেক বড় হবি তখন তোর এই কৃষক বাপকে আয়েশে রাখবি। কোনোদিন যদি শুনছি তোর বাপ তোর জন্য কষ্ট পাইছে তাইলে তোর কিডনি খুইলা আমার শোধ দিবি।

প্রিয় পাঠক, আপনারা ভাবছেন শুধু শুধুই মনে হয় একজন মানুষকে আমি হিরো বানিয়ে দিয়েছি। কিন্তু সত্যিই যে তিনি হিরো।

সেই সর্প ভাই পিএইচডি করতে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি দেন। যাওয়ার আগের দিন আমরা সবাই তার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম। তিনি আমাদের বললেন, তোদের দেশে আমার কোনো গতি হবে না। তাই চিন্তা করলাম বিদেশিদের পা চেটে যদি কিছু অর্জন করা যায়।

আমরা ভাবছিলাম সর্প ভাই হয়ত পিএইচডি করতে যাচ্ছেন বলে মহা খুশী থাকবেন। কিন্তু না; আমরা দেখলাম একজন হতাশা মাখা মানুষকে। যে মানুষটি আমাদের কাছে অচেনা, অজানা।

পিএইচডির এখনও একবছর বাকি। কিন্তু মায়ের অসুস্থ হওয়ার খবর শুনে দেশে এসেছেন।সর্প ভাই দেশে এসেই গ্রামে মায়ের কাছে চলে গিয়েছেন। আগামীকাল সকালে আবার চলে যাবেন। তাই গ্রাম থেকে আজ ঢাকায় আসবেন আমাদের সঙ্গে দেখা করতে।  আমরা সবাই সকাল থেকে অফিসের কাজ সেরে নিচ্ছি। সবার সঙ্গে সবার যোগাযোগ হচ্ছে। সর্প ভাই সন্ধ্যায় ক্যাম্পাসে আসবেন। আমরা অফিস থেকে সবাই সেখানে যাবো। প্রায় তিন বছর পর সর্প ভাইয়ের সঙ্গে আবারও আড্ডায় মেতে উঠবো।

৪.

বিদেশে গেলে মানুষজন একটু মোটাগাটা হয়ে যায়। সর্প ভাইও মোটা হয়েছেন। একটু ফর্সাও হয়েছেন। কিন্তু লেবাসের কোনো পরিবর্তন হয়নি। এখনো সেই নর্মাল পেন্ট আর শর্ট শার্ট। মেয়েরা যাকে বলে, লেবেন্ডিস!

শর্প ভাইকে দেখেই আমরা জড়িয়ে ধরলাম। রমজাম তো জড়িয়ে কেঁদেই দিল। কিন্তু শর্প ভাই বলছে, কি রে রমজান? তোর বাপ কই?

রমজান হাসতে হাসতে বলল, ভাইজান, কিডনি দেওন লাগবো না। বাপ এহন ঢাকায় আমার লগে।

আমরা সবাই হেসে উঠলাম। রমজান বিয়ে করেছে শুনে সর্প ভাই হাসতে হাসতে শেষ। বলে, শালার চাকরি পাইয়া ছাড়লি না বিয়া কইরা ফালাইলি! ধনটা সামলাইতে পারলি না!

রমজান তো বেচারা লজ্জায় শেষ। আমরা সবাই অধীর আগ্রহে সর্প ভাইকে দেখি। কোনো পরিবর্তন আছে নাকি। কথায় কথায় ইংলিশ বলে কিনা। গোল্ড লিফ সিগারেট ছেড়ে বিদেশি বেনসন খায় কিনা। দেখি নাহ! মানুষটা সেই আগের মতই আছে। কোনো পরিবর্তন নেই।

আমি একসময় বললাম, সর্প ভাই আমরা আপনার জন্য অপেক্ষা করছি। কবে যে পড়াশোনা শেষ করে দেশে ফিরবেন।

সর্প ভাই সঙ্গে সঙ্গে উত্তেজিত হয়ে গেলেন। মানে? আমি দেশে ফিরবো কেন? আর তুই অপেক্ষা করবি মানে!

আমরা সবাই তখন বললাম, এদেশটার যা অবস্থা আপনাদের মতো ইন্টালেকচুয়্যাল মানুষ যদি দেশে ফিরে না আসেন তাহলে দেশ তো আগের জায়গাতেই থেকে যাবে।

সর্প ভাই এবার সিগারেট ধরালেন। বললেন, দেশকে বদলানোর দায়িত্বটা মনে হয় তোরা আমার কাঁধে দিচ্ছিস! তোরা কি বসে বসে বাল ফালাবি? আমি নিজেকে শিক্ষিত হিসেবে বলতে পারি। তুইও তো শিক্ষিত। তো, তোরা কি চাকরি করবি আর ঘরে ঢুকে বউ লাগাবি। শালা বদমাইশগুলা। অ্যাবসার্ড কথা বলবি না আমার সঙ্গে।

এবার আমাদের গায়ে কথাটা লাগে। আমরা প্রতিবাদ করে উঠি। বলি, এর অর্থ কি সর্প ভাই? আমাদের যেই ক্ষমতা নেই। সেটা আপনার আছে। আপনার বুদ্ধি আছে। মেধা আছে। যেটা দিয়ে আপনি অনেক কিছু করতে পারবেন। আমরা তো আপনাকে সাপোর্ট দেব।

- এই তো! এদেশ বদলাবে কীভাবে? সবাই সাপোর্টার হতে চায়। কেউ নেতা হতে চায় না। কিন্তু বউ চুদার টাইমে কি তোদের সাপোর্টার লাগে?

এবার আমিও খেপে যাই। সর্প ভাই, কনটিনিউয়াসলি বাজে কথা ভালো লাগছে না। এখানে এমন বাজে কমেন্টের তো দরকার নেই।

সর্প ভাই হাসতে হাসতে বলেন, ওরে বাবা! সত্য কথা বলছি দেইখা শরীরে আগুন জ্বইলা গেল? কই আইসা তো আমার কলারটা ধইরা চড় থাপ্পড় লাগানোর সাহস পাইলা না। চুদার কথা কইছি আর খুব গায়ে লাগলো। কেন তুমি চুদবা না? নাকি বিয়া কইরা বলবা, সর্প ভাই আসেন আমার বউরে চুইদা যান। শালা তোরা হইলি কাপুরুষ। তোরা প্রতিবাদ করতে শিখস নাই। অন্যায় দেইখা দেইখা সহ্য করতে শিখখা গেছস। এই জাতির মেরুদন্ডই বাঁকা। খালি সোনাটা এখনও সোজা আছে।

আমরা সর্প ভাইকে খুবই সম্মান করতাম। কিন্তু আজকে কেন যেন খুবই রাগ হচ্ছে। মনে হচ্ছে তিনি রক্ষণশীল হয়ে উঠেছেন। যেই প্রতিবাদী বিপ্লবী সর্প ভাইকে আমরা দেখে দেখে অভ্যস্থ। সেই সর্প ভাইয়ের কথায় কোথায় যেন দেশদ্রোহীর আভাস পাচ্ছি। বিদেশের মোহে তিনি হয়ত স্বত্ত্বাও হারিয়ে ফেলেছেন।

সর্প ভাই আবার বললেন, শোন। তোরা রাগ কর। বিদ্রোহ কর। বদলে ফেল। এটাইতো দরকার। কিন্তু তোরা তো পারবি না। আমরা হচ্ছি সেই জাতি যারা নেতার জন্মের জন্য অপেক্ষা করি। কিন্তু নেতা হতে পারি না। বুঝলি। আমিও তো সেই জাতিরই সন্তান। আমিও চাই নেতা জন্মাক। কিন্তু আমি নেতা হতে চাই না। যে দেশে শিক্ষার চেয়ে অর্থের মূল্য বেশি সে জাতিকে কে বদলাবে? এই ধর তুই পড়েছিস ম্যাথ। পিউর ম্যাথ। অথচ চাকরি করছিস ব্যাংকে। মানে কি হলো? তোর জীবনের পুরোটাই বৃথা। তোর পেছনে রাষ্ট্র যে ইনভেস্ট করেছে সেটা ফেইল করেছে। একই সঙ্গে তোর মা বাপ তোকে যে জন্ম দিয়ে পড়াশোনা করিয়েছে সেটাও বৃথা। তুই যদি ভাবিস তুই চাকরি করছিস। ভালো বেতন পাচ্ছিস। মা-বাপ সুখে আছে; তাহলে ভুল। কারণ, তোর যেটা করার কথা ছিল তুই সেটা করিস নাই।

আমরা তখন বললাম, সেটা তো আমাদের দোষ না। রিলেটেড চাকরি তো খুঁজেছি। পাইনি। তাই ট্র্যাক চেইঞ্জ করেছি।

সর্প ভাই আবার বলা শুরু করলেন, হ্যাঁ। অবশ্যই। তাহলে মানে কি দাঁড়ালো? আমরা একটা ইমব্যালেন্সড সোসাইটিতে বাস করছি। রাষ্ট্র আমাদের সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারছে না। এবং আমরাও এটা মেনে নিয়েছি। কারণ, আসল কথা হলো টাকা। আমরা অন্য চাকরি করে টাকা কামাতে পারছি। সুতরাং চিন্তা কিসের।

হ্যাঁ সর্প ভাই। এজন্যই তো আপনাদের মতো লোকজন দরকার। যারা এগুলা নিয়ে শাউট করবে।

- না। এর দায়িত্ব তোমরাও। আমার একার না। তোমাকেও শাউট করতে হবে। আর যে রাষ্ট্রের রাজনীতির কোনো দর্শন নেই। নীতি নেই। সেই রাষ্ট্রে তোমার আমার শাউট কুকুরের চেয়ে অবহেলিত হবে। রাষ্ট্র তোমাকে কি দিয়েছে? বলো তো। কোন সুযোগটা তুমি পেয়েছ?

- আমি এখানে জন্মেছি। এটাই রাষ্ট্রের কাছে বড় পাওনা।

- ইমোশন! এখানেই জাতি মার খেয়েছে। ইমোশনের কাছে মার খেয়েছে। এই ইমোশন বেইচা রাজনীতি টিকে আছে। আমরা চিৎকার করে বলি, এদেশে ধর্ম বিক্রি করে রাজনীতি হয়। কিন্তু সবকিছুর আড়ালে ইমোশন বিক্রি করে দেশটাকে লুটে পুটে রাজনৈতিক দলগুলো খাচ্ছে এ নিয়ে কেউ কথা বলে না। আর শুন, আমি তো খুব তুচ্ছ মানুষ। বিশ্বে লক্ষ লক্ষ বাঙালি ছেলে মেয়ে ছড়িয়ে আছে। এরা কেউ বিজ্ঞানী, কেউ সমাজসেবক, কেউ প্রযুক্তিবিদ, কেউ কৃষিবিদ। এরা সবাই দেশে আসতে চায়। কিন্তু রাষ্ট্র চায় না তারা দেশে আসুক। তাহলে তো দেশের মানুষ বিপ্লব করে ফেলবে। আমাদের দেশের রাজনীতিবিদদের স্বার্থেই মেধাবীদের দেশে সুযোগ দেওয়া হবে না। বুঝলি? এ দেশটা সুন্দর। কিন্তু সুন্দর ধুয়ে কি আমি পানি খাবো? আমি গণিত নিয়ে শুধু শিক্ষকতা করতে চাই না। আমি গণিত নিয়ে গবেষণা করতে চাই। এমন সব গবেষণা যা দিয়ে বিশ্বকে অনেক দূর এগিয়ে নেয়া যাবে। রাষ্ট্র কি আমাকে সেই সুযোগ দেবে? হ্যাঁ। দেশের টানে আমি এখানে এসে কাজ করতে পারবো। কিন্তু নিজ উদ্যোগে করতে হবে। এবং যেখানে সরকারের কোনো সহযোগিতার প্রয়োজন হবে সেখানে আমাকে ঘুষ দিয়ে সেটা আদায় করতে হবে। আমলাদের তেলাতে হবে। তাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হবে। এতো কিছু করেও ধর আমি দেশে থাকবো। মনে কর আমার বেতন হলো সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা? কিন্তু একটা লেভেল মেইন্টেইন করতে গেলে ভবিষ্যতে আমাকে বাসা ভাড়া দিতে হবে ৫০ হাজার টাকা। বাকি টাকায় কি আমার বাজার সদাই, বউ বাচ্চা পুষতে পারবো? আর যদি চুরি বাটপারি করে সরকারি একটা প্রজেক্টে ঢুকি তবে উপরি ইনকাম হবে। তাহলে রাষ্ট্রের দূর্নীতির ভেতর আমার নামটাও  ঢুকে গেল। তাই না? সুতরাং প্রেক্ষাপট কে বদলাবে? আমি একা? কিংবা অন্য কেউ? একা কেউ এ দেশকে বদলাতে পারবে না। আমি তো মনে করি রাজনীতির পরিবেশ যতদিন সুস্থ না হবে ততদিন দেশ বদলাবে না। সম্ভব না। কারণ, যতই ব্যক্তিগত উদ্যোগ হোক। আল্টিমেটলি সেটা রাষ্ট্রের কর্তাদের হাতেই বড় আকার নেবে। আর যখন সেখানেই সিস্টেম নষ্ট  তো ভবিষ্যত কতটা উজ্জ্বল? এখন বলতে পারিস, রাজনীতিবিদ তৈরি করতে হবে। ছাত্র রাজনীতির অবস্থা তো তুমিও দেখেছ আমিও দেখেছি। ছাত্র রাজনীতির ঐতিহ্য আছে। ভাষা আন্দোলন, গণ অভ্যূত্থান, মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন। সফলতা। কিন্তু বর্তমানে কি অবস্থা? এখন সময় হয়েছে ঐতিহ্যকে গলা টিপে মেরে ফেলা। মানে ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করে দেয়া। দলীয় ফোরামে সরাসরি রাজনীতি হবে। কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাজনীতি হবে না। কিংবা অন্য কোনো ব্যবস্থা করা। কিন্তু এটা হবে না। কারণ, ছাত্ররাই তো রাজনীতিবিদদের প্রধান অস্ত্র। এটাকে তো তারা নিষ্কৃয় করে দিতে পারেন না। তাই না? এই দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উপচার্য নিয়োগ হয় দলীয় ফোরাম থেকে। তার মানে শিক্ষক হয়ে রাজনীতির সঙ্গে জড়িত হতে হবে। লাল দল, নীল দল, সাদা দল করতে হবে। তা না হলে লাভ নেই। আর যে শিক্ষক দলবাজী করে উপাচার্য হবেন। তার কাছে সেই বিদ্যাপিঠ কি আশা করতে পারে? দেশকে ভালোবাসো। কিন্তু দেশের ফেক্টগুলোতে স্বীকার করতে হবে। বুঝলা? দেশ দেশ বইলা গলাবাজি করলে হবে না। প্রতিবাদ করো। অথবা মইরা যাও।

তো, আপনি কি প্রতিবাদ করবেন না সর্প ভাই?

আমাদের প্রশ্নে সর্প ভাই চুপ হয়ে যান। মলিন চেহারা। ঠিক সেদিন যেভাবে প্রক্টোরের সামনে তিনি মলিন হয়ে গিয়েছিলেন। সেদিন তার মুখে কোনো কথা ছিল না। আজও নেই। এখনও এতো বিরোধী কথা বলেও তিনি চুপ। হয়ত কিছু চিন্তা করছেন। হয় করছেন না। কিংবা কি বলবেন তাই ভাবছেন। তিনি আরেকটি সিগারেট ধরান। মুখ দিয়ে ভটভট করে ধোঁয়া বের হয়। আমরা সেই ধোঁয়ার দিকে তাকাই। সর্প ভাইয়ের সিগারেটের ধোঁয়া বাতাসে মিশে যায়। এক সময়ে তুখড় জনপ্রিয় আমাদের সর্প ভাই। আমাদের পছন্দের সর্প ভাই কোনো কথা বলছেন না। কিন্তু আমরা শুনতে চাই। তিনি যে আমাদের কাছে নেতা। রাষ্ট্র তার গুরুত্ব বোঝে না। হয়ত কোনোদিন বুঝবে না। কিন্তু আমরা বুঝি। আমরা জানি সর্প ভাই চাইলে আজই বিপ্লব ঘটাতে পারেন। আমরা এটা বিশ্বাস করি। আপনারা হয়ত ভাবছেন, আমি সর্প ভাই অতিমাত্রা হিরো বানিয়ে দিয়েছি। কিন্তু খোঁজ নিয়ে দেখেন আপনার আশেপাশেও সর্প ভাই আছে। সব সর্পকে যদি আমরা এক করতে পারতাম তবে এদেশটা কবেই যে বদলে যেত। সর্প ভাই একটা আইকন। তার ভাবনার সঙ্গে আমাদের ভাবনা মিলবে না। এটাই তো স্বাভাবিক। সর্প ভাইয়ের ভাবনা ভিন্ন হবেই। তাই তো তারা ভিন্ন।

সর্প ভাই হঠাৎ করেই আবার কথা বলে ওঠেন। তবে এবার গলার স্বর খুবই নিচু। ধীরে ধীরে বলেন, আমি ছিলাম গ্রামের সেরা ছাত্র। আমার আশেপাশের সবাই যখন ইন্টারমিডিয়েটের পরে সৌদি আরব, মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টা করছে। আমি তখন বই খাতা নিয়ে ঢাকা এসেছি পড়তে। লক্ষ্য একটাই। গণিত। ফ্রেডরিক গাউস হবো। বাংলাদেশের টাকায় আমার ছবি থাকবে। এদেশ একদিন বিজ্ঞানীদের মর্ম বুঝবে। কচি বয়সে তো এমনই স্বপ্ন দেখেছি। আমার বাবা বলতেন, ‘টাকার চেয়ে শিক্ষার সার্টিফিকেট অনেক শক্তিশালী। টাকা যেভাবেই হোক কামানো যায়। কিন্তু শিক্ষা অর্জন করতে হয়। সেটা অমূল্য। আজ মরে গেলে কাল আমার সব অর্থ অন্য কারো। কিন্তু শিক্ষা শুধু নিজের। দুনিয়াতে এই একটি জিনিসই মানুষের নিজের। বাকি সব অন্যের। আর কিছু মহা মানব দুনিয়াতে আসেন। যারা নিজের জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে বুঝিয়ে দেন শিক্ষাও সবার। জ্ঞান সর্বজনীন। তুই এমনই মহামানব হ। সাফল্য অর্জনের চেয়ে স্বার্থক জীবনের মূল্য অনেক।’

বাবার কথা বলার সময় সর্প ভাইয়ের চোখ দিয়ে পানি পড়ছিল। আমরাও তখন চুপ করে বসে আছি। সর্প ভাই বলেন, আমার ঘরের আশেপাশে সব দু’তলা তিন তলা দালান দাঁড়িয়ে গেছে। সৌদি আরব, মালয়েশিয়ার টাকায় গড়ে উঠছে ঝকঝকে দালান। আর আমার সে মাটির ঘর মাটিরই রয়ে গেল। সেই মাটির ঘরে আমার মা একা নিঃসঙ্গ জীবন কাটায়। আমাকে বলে, মাটির ঘরই ভালো বাবা। ঠান্ডা থাকে। আরাম লাগে। তুই পড়। পড়… আমি পড়ি। শালার ইমব্যালেন্সড সোসাইটি।  শালার ফাকিং লাইফ। পিএইচডি করে কি হবে? মাকে তো কোনো দালান করা বাড়ি তৈরি করে দিতে পারছি না।

তখন অন্ধকার নেমে এসেছে। আকাশে কালো মেঘ। মেঘের গর্জনও পাওয়া যায়। সর্প ভাই আকাশের তাকিয়ে বলে, বর্ষার প্রথম দিন। প্রথম বৃষ্টি হবে। বলতে বলতেই বৃষ্টি নেমে গেল। আমরা টং দোকানের টিনের নিচে আশ্রয় নেই। আর সর্প ভাই, বৃষ্টিতে ভেজার জন্য মাঠে গিয়ে দাঁড়ায়। চিৎকার করে আমাদের বলে, ওই শালার কা-পুরুষগুলা। দেশ দেশ বইলা চিল্লাও। মন্দকে বদলানোর কথা বলো। আর দেশের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তে চিপায় লুকাও। শালার কাওয়ার্ড। তোদের দেশে আসবো আমি। চিন্তা করিস না। এতো সুন্দর প্রকৃতির মিউজিক কোথায় পাবো বল? এতো মায়া কোন দেশে আছে বল?

ভেজা ও ঘাসের গন্ধে চারিদিক ম ম করে উঠেছে। আমাদের চোখ বেয়ে পানি পড়ছে। আমরা সবাই দৌঁড়ে যাই সর্প ভাইয়ের কাছে। আমাদের বিপ্লবী সর্প ভাই। জড়িয়ে ধরি। সর্প ভাইকে কাঁদতে দেখিনি কোনোদিন। আজই দেখলাম। কাঁদতে কাঁদতে বলে উঠলেন, আহ্! মা…